হুলিও কোর্তাসার’র সাক্ষাৎকার :: অনুবাদ : অমিত চক্রবর্তী

হুলিও কোর্তাসার ( Jules Florencio Cortázar), জন্ম: আগস্ট ২৬, ১৯১৪, বেলজিয়াম। মৃত্যু: ফেব্রুয়ারি ১২, ১৯৮৪, ফ্রান্স। জাতীয়তা: আর্জেন্টাইন। কোর্তাসার লাতিন সাহিত্যের অন্যতম নন্দিত ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। সমগ্র আমেরিকা ও ইউরোপের স্প্যানিশ ভাষাভাষী পাঠক ও লেখকদের উপর তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। কোর্তাসারকে লাতিন আমেরিকান জাগরণের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। দ্বিতীয় উপন্যাস হপস্কচ তাঁকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দিলেও মূলত তাঁর জাদুবাস্তব ছোটগল্পগুলোর জন্যই তিনি সবচেয়ে বেশি সমাদৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প অনুসরণ করেই বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আন্তোনিয়োনি নির্মাণ করেন “ব্লো-আপ” সিনেমাটি। ১৯৮৪ সালে প্যারিস রিভিউ তাঁর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। প্যারিস রিভিউ’র পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জেসন বেইজ। নকটার্ন’র পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছে অমিত চক্রবর্তী

প্যারিস রিভিউ: আপনার নতুন বই দেশোরাস’র কিছু কিছু গল্প পড়লে মনে হয় যে, ফ্যান্টাসটিক বাস্তবের খুব ভেতরে ঢুকে পড়ছে। আপনার কি কখনো মনে হয়েছে যে, কল্পনা ও বাস্তবতা এক হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ?

হুলিও কোর্তাসার: হ্যাঁ, সাম্প্রতিক সময়ের গল্পগুলাতে এই দূরত্ব কমে যাওয়ার ব্যাপারটা আমি অনুভব করতে পারি। পুরোনো গল্পগুলাতে এই দূরত্ব বিশাল ছিল, কারণ ফ্যান্টাসটিক প্রকৃত অর্থেই ছিল ফ্যান্টাসটিক, কখনো কখনো কিছুটা অতিপ্রাকৃতের ছোঁয়া-ও ছিল অইগুলাতে। কিন্তু, কল্পিত বাস্তবতার তো বিবর্তন ঘটে, বদলায় জিনিসটা। ব্রিটিশ গোথিক উপন্যাসের শুরুতে যে-ফ্যান্টাসটিক আমরা দেখি, উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে, অইগুলা তো এখন আর রেলেভেন্ট না। চিন্তা করো হোরাস ওয়ালপোল’র ওরট্যান্টোর দূর্গ বইটার কথা। সাদা কাপড় পরা ভূত, শেকলের শব্দ করতে করতে হাঁটতে থাকা কঙ্কাল। আমরা তো হেসে উঠি অইটা পড়লে। এখনকার দিনে আমার যে ফ্যান্টাসটিকের ধারণা, অইটা বরং বাস্তবতার অনেক কাছাকাছি। কারণ, সম্ভবত আমরা যে-বাস্তবতায় বাস করি, অইটা ক্রমশ এক ফ্যান্টাসির দিকেই যাচ্ছে।

: লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু স্বাধীনতার সংগ্রামকে সাপোর্ট করতে গিয়ে সাম্প্রতিকে আপনার অনেকটা সময় তো চলে গ্যালো। তো এটা কি আপনার ক্ষেত্রে কল্পনা আর বাস্তবতাকে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসে নাই এবং আপনাকে আরো সিরিয়াস বানিয়ে দ্যায় নাই?

:ওয়েল, “সিরিয়াস” বিষয়টার ধারণা আমার পছন্দ না, কারণ আমি কখনোই  মনে করি না আমি সিরিয়াস, অন্তত সিরিয়াস পুরুষ ও মহিলার কথা বললে যে-ধরণের পুরুষ ও মহিলার কথা আমাদের মনে আসে। কিন্তু, গত কয়েক বছরে লাতিনের বেশ কিছু দেশে —আর্হেন্তিনা, চিলে, উরুগুয়ে এবং এখন সব কিছুর উপরে নিকারাগুয়া—আমার যে কাজ, এটা আমাকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে যে, আমি বেশ কিছু গল্পে ফ্যান্টাসটিক ব্যবহার করছি এই বিষয়টাকে ডিল করার জন্য, এবং আমার মতে এই ফ্যান্টাসটিকটা বাস্তবতার খুব কাছাকাছি। ফলে নিজেকে এখন আমার একটু কম স্বাধীন মনে হয় আগের চেয়ে। ত্রিশ বছর আগে যা মাথায় এসেছে তাই লিখেছি এবং আমি কেমন জানি নান্দনিক একটা ক্রাইটেরিয়া দিয়েই জিনিসটাকে বিচার করেছি। এখন যদিও আমি নান্দনিক বিবেচনা দিয়েই এইগুলাকে বিচার করি, কারণ সবার আগে আমি একজন লেখক—কিন্তু, এখন আমি একজন আহত লেখক, একজন লেখক যে লাতিনের পরিস্থিতিতে একদম মগ্ন; এর ফলে এটা লেখালেখিতে চলে তো আসেই, সচেতন বা অবচেতন উপায়ে। কিন্তু, গল্পগুলোতে যদিও আদর্শগত ও রাজনৈতিক প্রশ্নের সরাসরি রেফারেন্স আছে, তবুও আমার গল্প মূল জায়গায় বদলায় নাই। আমার গল্প এখনো অদ্ভূত, কল্পিত বাস্তবতার।

একজন “নিবেদিত”—এখন তো তারা এটাই বলে—লেখকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কন্টিনিয়াসলি লেখক হয়ে থাকা। যদি সে যা লিখে, তা স্রেফ রাজনৈতিক বস্তু সম্বলিত সাধারণ সাহিত্য হয়, তবে সেটা তো খুবই মাঝারি মানের হয়ে যেতে পারে। অনেক লেখক-সাহিত্যিকের ক্ষেত্রেই এটা হয়। তো, মূল সমস্যা হলো ভারসাম্যের। আমার জন্য, যা আমি করি, তাকে সব সময়েই সাহিত্য হতে হবে, সর্বোচ্চ আমি যা করতে পারি… যা সম্ভবপর, সেটাকে পার করে যাওয়া। কিন্তু, ঠিক এর সাথেই সমকালীন বাস্তবতার একটা প্রসঙ্গ রেখে যাওয়া এবং এটা খুবই কঠিন এক ভারসাম্য। দেশোরাস’র ইঁদুর বিষয়ক গল্পটা, যেটা আর্হেন্তিনার গেরিলা সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে করা—শুধু রাজনৈতিক পর্যায়ে থেকে যাওয়ার একটা প্রলোভন কাজ করছিল অইখানে।

: আচ্ছা এই গল্পগুলার প্রতিক্রিয়া কিরকম পাইলেন? সাহিত্যের লোকজনের প্রতিক্রিয়ার সাথে রাজনৈতিক লোকজনের প্রতিক্রিয়ার কোনো পার্থক্য ছিলো কিনা?

: অবশ্যই। আর্হেন্তিনার বুর্জোয়া পাঠক যারা রাজনীতি নিয়ে উদাসীন অথবা ডান-ডানার লোকজন, তারা আমি যেইসব বিষয় নিয়ে ভাবিত- শোষণ, বঞ্চনা প্রভৃতি- এইগুলার ব্যাপারে উদাসীন। আমার গল্পগুলা রাজনৈতিক মোড় নেয় ক্যানো এইটা নিয়েও তাদের দুঃখের শেষ নাই। আবার তরুণ প্রজন্ম, যারা আমার মতোই এইসব বিষয় নিয়ে ভাবে এবং সাহিত্য-অন্তঃপ্রাণ, তারা কিন্তু এই গল্পগুলা খুব পছন্দ করে। কুবান’রা মিটিং গল্পটা নিয়ে চমৎকৃত, নিকারাগুয়ানরা আপোক্যালিপ্স এট সলেন্তিনামে গল্পের কাছে বার বার ফিরে আসে।

:আপনাকে ক্রমশ রাজনীতি সংলগ্ন করল কোন কোন জিনিস?

: দক্ষিণ আমেরিকার সামরিক বাহিনি—এরাই আমাকে আরো পরিশ্রমের দিকে চালনা করে। এদের উৎখাত করার যদি কোনো ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে হয়ত আমি কিছুটা বিশ্রাম নিতাম আর ‘শৈল্পিক’ গল্প-কবিতা লিখতে থাকতাম। কিন্তু, এইগুলার জ্বালায় তো পারি না।

: আপনি অনেকবার বলেছেন সাহিত্য আপনার কাছে একটা খেলার মতন। কিভাবে?

: আমার কাছে সাহিত্য এক ধরণের খেলা। খেলা দুই রকমের। যেমন ফুটবল, যেইটা একটা ক্রীড়া মাত্র। আবার অন্য খেলা আছে, যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর সিরিয়াস। যেমন শিশুরা নিজেদের মনোরঞ্জনের জন্য খেললেও খুব সিরিয়াসলি নেয় বিষয়টাকে। যতোটা সিরিয়াসলি দশ বছর পরে প্রেম করবে তারা। মনে আছে, ছোটবেলায় বাবা-মা যখন বলত, ‘অনেক খেলেছ, এখন এসে স্নান কর’—আমার কাছে বিষয়টা খুব ইডিওটিক মনে হত, কারণ স্নান করা ছিল খুবই সিলি বিষয় আমার জন্য। কোনো গুরুত্বই ছিল না এইটার, যে-রকম ছিল বন্ধুদের সাথে খেলার ঘটনাটা। সাহিত্য-ও অইরকমই—এটা একটা খেলা, এমন একটা খেলা, যার জন্য জীবন দিয়ে দেয়া যায়। যে-কোনো কিছু করা যায় যে খেলার জন্য।   

 : ফ্যান্টাসটিকের দিকে আকৃষ্ট হলেন কবে? তারুণ্যে?

: শৈশবে। আমার সহপাঠীদের কোনো আগ্রহ ছিল না এইসবে। তারা জিনিসগুলো যেমন তেমনভাবেই দেখতে পেত… এটা একটা গাছ, এটা একটা আর্মচেয়ার। কিন্তু, আমার কাছে সব কিছু অতো সংজ্ঞায়িত হয়ে ধরা পড়ত না। আমার মা এখনো জীবিত এবং তিনি খুবই কল্পনাপ্রবণ, উৎসাহ দিতেন আমাকে। সিরিয়াস হওয়ার পরিবর্তে আমার কল্পনাপ্রবণ হওয়াটা উনাকে খুশি করেছিল, উনি আমাকে অনেক বইপত্র দিয়েছেন। মাত্র নয় বছর বয়সে আমি এডগার এলান পো পড়েছি। চুরি করে পড়েছিলাম, কারণ মা চায় নাই আমি এটা পড়ি, মনে করেছিলেন এটা পড়ার মতো বয়স আমার হয় নাই এবং সেটা তো ঠিকই ছিল। বইটা পড়ে ভয় পেয়ে তিন মাস অসুস্থ ছিলাম, কারণ আমি বিশ্বাস করেছিলাম বই-এর সব কথা। যে-রকম ফরাসিরা বলে, du comme fer। অতিপ্রাকৃতই আমার জন্য ছিল বাস্তব, কোনো সন্দেহই ছিল না। এরকম ছিলাম শৈশবে। আমার বন্ধুদের এই বইগুলা দিলে ওরা বলত, ‘ ‘ধুর! আমরা কাউবয়’র গল্প পড়তে চাই’’। কাউবয় খুব জনপ্রিয় ছিল অইসময়, কেন আমি জানতাম না, আমার মাথায় ঢুকত না। আমার পছন্দ ছিল অতিপ্রাকৃতের, ফ্যান্টাসটিকের অপর ভুবন।

: পরে যখন আপনি পো’র রচনাসমগ্র অনুবাদ করলেন, তখন কি নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন আপনার নিবিড় পাঠ থেকে?

: অনেক, অনেক কিছু। আমি তাঁর ভাষা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম, কারণ ব্রিটিশ ও আমেরিকানরা খুব সমালোচনা করত তাঁর ভাষার, ’অতিমাত্রায় বারোক’ বলত। আমি ব্রিটিশ বা আমেরিকান না-হওয়ায় ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাঁর ভাষাকে দেখলাম। আমি জানি, কিছু কিছু বিষয় তো পুরোনো হয়ে গ্যাছেই, অতিকথনের পর্যায়ে চলে গিয়েছে, কিন্তু, তাঁর জিনিয়াসের সাথে কোনো তুলনা চলে না এসবের। অই সময়ে দ্য ফল অফ দ্য হাউজ অফ আশার অথবা দ্য ব্ল্যাক ক্যাট—প্রভৃতি এক অস্বাভাবিক ক্ষমতাকে তুলে ধরে, ফ্যান্টাস্টিক বা অতিপ্রাকৃত’কে মাস্টার করার। কাল এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, রু এডগার এলান পো’তে। দেখলাম একটা ফলকে লেখা, “এডগার পো, ইংলিশ লেখক।“ কিন্তু, সে তো একদমি ইংলিশ ছিল না। আমাদের এটা চেইঞ্জ করানো উচিত—চলো দুইজন মিলে প্রতিবাদ করি!

: আপনার লেখায় ফ্যান্টাসটিকের পাশাপাশি চরিত্রদের প্রতি আপনার একটা উষ্ণতা, মমতার জায়গা আমরা চিহ্নিত করতে পারি।

: আমার চরিত্ররা যখন বিশেষত শৈশব আর বয়ঃসন্ধিকাল অতিক্রম করছে, তখন তাদের প্রতি আমার অনেক কোমলতা কাজ করে। আমার মনে হয় যে, তারা খুবই জীবন্ত আমার গল্প-উপন্যাসে, তাদের প্রতি খুব মমতা অনুভব করি। যখন আমি এক বয়ঃসন্ধিকালের ভেতর দিয়ে যাওয়া কিশোরের গল্প লিখছি, তখন আমিই সেই কিশোর, যে নিজের গল্পটাই লিখছে। বয়স্ক চরিত্রের ক্ষেত্রে এইটা ঘটে না।

: আপনার অনেক চরিত্রই কি আপনার পরিচিত মানুষের রিফ্লেকশান?

: আমি বলব না যে অনেক, কিন্তু কয়েকটা তো আছে। অনেক সময়ই একটা চরিত্র দুই বা তিনটা মানুষের মিক্সচার। যেমন, আমি একটা মহিলা চরিত্র আমার পরিচিত দুই নারীর ভিত্তিতে বানিয়েছি। এইক্ষেত্রে যেটা হয় যে, বইয়ের চরিত্রটা আরো জটিল আর ডিফিকাল্ট হয়ে ওঠে।

 : তাইলে আপনি বলছেন যখন একটা চরিত্রকে একটু ‘ভারী’ করা দরকার হয়, তখন আপনি দুইটা মানুষকে এক করেন?

: না এইরকম না টোটালি। চরিত্রগুলাই আমাকে বলে। এইটা এইরকম যে, আমি একটা চরিত্রকে দেখি, এবং আমার পরিচিত কারো কথা মনে হয়, মাঝে মাঝে দুইটা লোকের কথা মনে হয়, তারপরে এটা থেমে যায়। তারপর চরিত্রেরা নিজে থেকেই কাজগুলা করা শুরু করে। সে কথা বলে… আমি জানিও না ওরা কি বলবে যখন আমি সংলাপ লিখছি… সত্যি, এইটা তাদের উপর নির্ভর করে। আমি জাস্ট ওরা যেটা বলছে সেটা টাইপ করছি। মাঝে মাঝে আমি অট্টহাসি দেই, অথবা পেইজটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলি, “তুমি এইখানে খুবই আজাইরা কথা বলছো, বাদ!” তারপরে নতুন পাতায় তাদের সংলাপগুলা লিখা শুরু করি।

: তাহলে চরিত্রই আপনাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়?

: একেবারেই না। অনেক সময় আমার মাথায় গল্পের একটা আইডিয়া থাকে, বাট কোনো চরিত্রই থাকে না অইসময়। আজব কোনো আইডিয়া আসবে মাথায়, যে-রকম কিছু একটা হচ্ছে গ্রামের এক বাড়িতে, আমি দেখি… লেখার সময়টা খুবই ভিজুয়াল আমার কাছে, আমি সবই দেখতে পাই, যা ঘটে। তো অই সময়, আমি গ্রামের অই বাড়িটা দেখি আর হঠাৎ করেই চরিত্রগুলাকে অই পরিস্থিতিতে বসাইতে থাকি। তো অই পর্যায়ে একটা চরিত্র এমন হইতে পারে যাকে আমি চিনতাম। এটা শিউর কিছু না। শেষ পর্যন্ত আমার বেশিরভাগ চরিত্রই আবিষ্কৃত । এখন, কথা হল, অবশ্যই আমিও তো আছি। যেমন হপস্কচ-এ অনেক ঘটনাই আছে অলিবেইরা’র যেইগুলা আমার জীবন থেকে নেয়া। এইটা আমি না, কিন্তু অনেক কিছুই প্যারিসে আমার বোহেমিয়ান লাইফের থেকে নেয়া। তারপরও যেইসব রিডার অলিবেইরাকে “প্যারিসে কোর্তাসার” এমনভাবে পড়বে, ওরা ভুলই পড়বে। আমি অনেক ডিফ্রেন্ট ছিলাম অলিবেইরার থেকে।

: সেটা কি এই কারণে যে, আপনি চান নাই আপনার রাইটিং আত্মজীবনীমূলক হোক?

: আমি আত্মজীবনী পছন্দ করি না। আমি কোনোদিন মেমোয়ার লিখব না। অন্যদের আত্মজীবনীর প্রতি আমার আগ্রহ আছে ঠিকই, বাট নিজেরটার প্রতি নাই। আমার যদি আত্মজীবনী লিখতেই হয়, তাহলে সত্য কথাই তো লিখতে হবে। কাল্পনিক আত্মজীবনী লেখা আমারে দিয়া হবে না। তো, আমারে একজন ইতিহাস লেখকের কাজ করতে হবে, নিজের ইতিহাস লিখতে হবে। এইটা খুবই বোরিং আমার জন্য। কারণ, আমি আবিষ্কার করতে, কল্পনা করতে পছন্দ করি। অবশ্যই কখনো কখনো আমি গল্প/ উপন্যাস লিখতে গিয়ে দেখি যে, আমার জীবনের ঘটনাই অই কন্টেক্সটের ভিতর নিজেকে বসাচ্ছে। এই যেমন দেশোরাস’র গল্পে এই যে ছেলেটা, তার বন্ধুর বড় বোনের প্রেমে পড়ে, এইটা আত্মজীবনীমূলক একটা ঘটনা। তো ছোট একটা অটোবায়োগ্রাফিকাল অংশ থাকেই, কিন্তু অইখান থেকে, অই কাল্পনিক বা ফ্যান্টাস্টিকই ডমিনেইট করে বাকিটা।

: আপনি গল্প লেখা কিভাবে শুরু করেন? কোনো পার্টিকুলার বিষয়, ইমেইজ?

: আমার জন্য গল্প/ উপন্যাস এইগুলা যে-কোনো জায়গা থেকেই শুরু হতে পারে। কিন্তু, যখন লেখা শুরু করছি, তখন সাধারণত গল্পটা অনেকদিন ধরে আমার মাথার ভেতর ঘুরতেছে। কিন্তু, পরিষ্কার কোনো উপায়ে না, জাস্ট জেনারেল আইডিয়াটা। যেমন, অই বাসার এক কোণায় একটা লাল গাছ আছে, আর আমি জানি একটা বুড়া লোক অই বাসার চারপাশে ঘোরে। তো এর বেশি আমি কিছু জানি না তখনো। তারপরে আসে স্বপ্নগুলা। এই প্রসবকালীন সময়ে আমার স্বপ্নে অনেকগুলা রেফারেন্স/ ঘটনা ইত্যাদি আসে, যেইগুলা গল্পে থাকবে। মাঝে মাঝে সারা গল্পটাই তো একটা ড্রিম। আমার প্রথম দিকের জনপ্রিয় গল্প, বাড়িদখল একটা দুঃস্বপ্ন নিয়ে লেখা। আমি সাথে সাথে উঠে গল্পটা লিখে ফেলছিলাম। কিন্তু, সাধারণত স্বপ্নে যেটা উঠে আসে, সেটা রেফারেন্সেই সীমিত। এইটা হল আমার অবচেতনের একটা গল্পের মাধ্যমে কাজ করার একটা প্রক্রিয়া—যখন আমি স্বপ্ন দেখছি, মাথার ভেতরে গল্পটা লিখা হচ্ছে। তো যখন আমি বললাম যে, যেকোনো জায়গা থেকে শুরু হতে পারে, এটার মানে হল আমি তখনো জানি না শুরু বা শেষটা কী হবে। যখন আমি লেখা শুরু করি, সত্যি বলতে অই সময়ই গল্পটা শুরু হয়। এইটা আমার সিদ্ধান্তের ব্যাপার না, স্রেফ অই ভাবেই শুরু হয় ও চলতে থাকে এবং অনেক সময়ই কোনো ধারণা থাকে না আমার যে এর পরে কী ঘটবে। এটা স্রেফ গল্প যখন আগাইতে থাকে, বিষয়টা স্পষ্ট হয় এবং হঠাৎ শেষটা আমার সামনে ভেসে ওঠে।

: মানে, আপনি লিখতে লিখতেই গল্পটা আবিষ্কার করছেন?

 : এক্সেক্টলি। এইটা জ্যাজ-এ ইম্প্রোভাইজ করার মতোই একটা বিষয়। তুমি যদি কোনো জ্যাজ শিল্পীকে জিজ্ঞেস কর  সে কী বাজাবে, সে হাসবে তোমাকে নিয়ে। তার একটা থিম আছে, কয়েকটা কর্ড আছে, যেইগুলা তাকে মানতে হবে, আর তারপর সে তার ট্রাম্পেট বা স্যাক্সোফোন হাতে নিবে এবং বাজানো শুরু করবে। এইটা কোনো আইডিয়ার প্রশ্ন না। তার ভিতরের পালসগুলা থেকেই সে বাজাবে। কিছু কিছু সময় এটা চমৎকারভাবে বেড়িয়ে আসবে, কিছু সময় আসবে না। আমার ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। মাঝে মাঝে আমার গল্পগুলা নিয়ে বিব্রত বোধ করি। উপন্যাসগুলা নিয়ে কখনোই সেটা হয় না, কারণ উপন্যাসের জন্য আমি অনেক কাজ করি, একটা পুরা অবকাঠামো আছে জিনিসটার। কিন্তু, গল্পগুলা… গল্পগুলা এইরকম যে, আমার ভেতর থেকে কেউ এইগুলা আমাকে বলছে আর আমি লিখছি, কিন্তু আমি রেসপন্সিবল না। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত এইগুলা যেহেতু আমারই, তো আমার স্বীকার করে নেয়া উচিত গল্পগুলাকেও।

: গল্প লেখার এমন কোনো বিষয় আছি কি, যেইটা আপনার কাছে সব সময় সমস্যাজনক মনে হয়?

: সাধারণত না, কারণ যেইটা বলতেছিলাম, গল্পটা অলরেডি আমার ভেতরে কোথাও লেখা হয়ে আছে। ফলে, এটার একটা মাত্রা, কাঠামো আছে—এইটা খুব লম্বা বা ছোট কোনো গল্প হবে কিনা, সেটা যেন আগে থেকেই ঠিক করা আছে। কিন্তু, রিসেন্টলি আমি কিছু সমস্যা অনুভব করা শুরু করেছি। শাদা পাতার সামনে আমি যেন  অনেক বেশি রিফ্লেক্ট করতেছি। অনেক ধীরে লিখতেছি। একটা আলগা ভাব আছে লেখার মধ্যে। সমালোচকেরা এটা নিয়ে বলেছেও যে, আমরা গল্পের যে সহজতা বা ফ্লেক্সিবিলিটি, সেটা হারাচ্ছে—আমি যেইটা বলতে চাচ্ছি সেটা খুবই অল্পের উপর দিয়ে বলতে চাচ্ছি। আমি জানি না, এইটা ভালো না খারাপ। কিন্তু, এইভাবেই আমি এখন লিখতেছি।

: নভেলের ব্যাপারে একটা অবকাঠামোর কথা বলছিলেন। এর মানে কি এইটা যে, আপনি নভেলের কাজটা খুব ভিন্নভাবে করেন?

: হপস্কচ-এ প্রথম যেই জিনিসটা আমি লিখছিলাম, সেইটা এখন মাঝখানের একটা জায়গায়। অই-যে একটা অধ্যায় আছে না, যেইখানে চরিত্রগুলা এক এপার্টমেন্ট থেকে আরেকটা এপার্ট্মেন্টে যাওয়ার জন্য তক্তা পাতায়? অইটা। আমি অই পর্ব লিখেছি, কেন লিখতেছি সেটা না জেনেই। আমি অই চরিত্রগুলারে আর পরিস্থিতিটা দেখলাম, বুয়েনোস আইরেসে ছিলাম তখন। মনে আছে প্রচণ্ড গরম ছিল, আর আমি জানালার পাশে টাইপরাইটার নিয়ে বসে ছিলাম। আমি দেখলাম একটা লোক তার বউরে তক্তার উপর দিয়ে যেতে সাহায্য করতেছে, সম্ভবত সিলি কোনো জিনিস আনার জন্য, পেরেক বা অইরকম কিছু। তো, আমি অইসব লিখলাম, প্রায় চল্লিশ পাতার মত, অনেক বড়, তারপর যখন শেষ করলাম, তখন নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা আমি কী লিখলাম এইটা? কারণ, এইটা তো গল্প না। তাহলে কী এইটা?” তারপর আমি বুঝলাম একটা নভেলের ভিতর আমি ঢুকে পড়ছিলাম, কিন্তু, আমি যে অই জায়গা থেকে কন্টিনিউ করতে পারব না, সেটাও বুঝতে পারছিলাম। আমাকে অইখানে থামতে হয়েছিল আর প্যারিসের পুরা অংশটা লিখতে হয়েছিল, যেটা ছিল অলিবেইরার ব্যাকগ্রাউন্ড এবং তারপর আমি অই তক্তার অধ্যায়ে আসলাম, আর এর পরের কাহিনি লিখতে লাগলাম।

: আপনি কি রিভাইস করেন নিজের লেখা?

: খুব কম। এইটা অই জায়গা থেকে যে, জিনিসগুলা আগে থেকেই আমার ভেতরে কাজ করতে থাকে। যখন আমার সমসাময়িকদের প্রথম ড্রাফটগুলা আমি দেখি, যেইখানে সবকিছু সংশোধিত, পরিবর্তিত, এইখানে-অইখানে নাড়াচাড়া করায় ভর্তি… না না না। আমার পাণ্ডুলিপিগুলা একদম ঝকঝকে, পরিষ্কার।

: হোসের লিমা’র পারাদিসো’তে সেমি বলছে, “স্পেইন আর লাতিন আমেরিকায় বারোক হচ্ছে ‘সত্যিকারের’ ইন্টারেস্টের জায়গা” – এই ব্যাপারে আপনার মত কি?

: কোনো এক্সপার্ট হিসাবে এইটার উত্তর দিতে পারব না। এটাতো সত্যিই যে, লাতিন আমেরিকায় বারোক খুবই গুরুত্বপূর্ণ, শিল্প ও সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই। বারোক অফুরান প্রাচুর্যের উৎস, কল্পনারে এটা তার নানাবিধ সর্পিল দিকে নিয়ে যেতে পারে, যেমন আপনি যদি বারোক চার্চের দিকে তাকান, এর আলংকারিক এঙ্গেলগুলার দিকে নজর দ্যান অথবা সঙ্গীতে যে বারোক’টা আছে। কিন্তু, বারোকে আমি অবিশ্বাস করি। বারোক লেখকেরা প্রায়শই খুব সাধারণ পদ্ধতির দিকে যান লেখালেখির ক্ষেত্রে। দেখবেন যেটা এক পৃষ্ঠায় লিখা যায়, সেটা পাঁচ পৃষ্ঠায় লিখছে। আমিও হয়ত বারোকের মধ্যে পড়ে গ্যাছি, যেহেতু আমি লাতিন আমেরিকান, কিন্তু এটার প্রতি আমি সব সময় একটা অবিশ্বাস বজায় রেখেছি। আমি ফুলানো-ফাঁপানো, সুদীর্ঘ বাক্য পছন্দ করি না, যেইগুলা নানান ধরণের বিশেষণ আর বর্ণনা দিয়ে ভরা, কেমন যেন ঘ্যানঘ্যান করে রিডারের কানে।  আমি জানি, এইটা খুব সুন্দর আর চার্মিং, কিন্তু এইটা আমার জন্য না। আমি কিছুটা বোর্হেসের সাইডে। উনি জন্ম থেকে বারোকের শত্রু, লেখাকে খুব আঁটসাঁট রেখেছেন, যেন প্লায়ার্স দিয়ে। ওয়েল, আমি বোর্হেসের চেয়ে পুরাপুরি ভিন্ন তরিকায় লিখি, কিন্তু যেই শিক্ষাটা আমি পেয়েছি উনার কাছ থেকে সেটা হচ্ছে একোনমি। যখন খুব কম বয়সে উনার লেখা পড়া শুরু করেছিলাম, উনি আমাকে শিখিয়েছেন যে, যেইটা বলতে চাই, সেটা মিতভাষ বা একোনমির ভেতর দিয়ে বলতে হবে। কিন্তু, মিতভাষটাকে খুব সুন্দর হতে হবে। মনে হয় এটাই পার্থক্য একটা গাছের সাথে, যেইটারে আমরা বারোক বলতে পারি এটার ডালপালার বিস্তারের জন্য, একটা ক্রিস্টালের, যেইটা আমার কাছে গাছের চাইতে বেশি সুন্দর।

: আপনার লেখালেখির অভ্যাসটা কী রকম? কোনো কিছু কি বদলেছে সময়ের সাথে সাথে?

: একটা জিনিস যেটা বদলায় নাই এবং কখনোই বদলাবে না, সেটা হচ্ছে – নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলা। আমার ধরাবাঁধা কোনো তরিকা নাই। আমার যখন একটা গল্প লিখতে ইচ্ছা হয়, আমি সব কিছু বাদ দিয়ে গল্প লিখতে বসে যাই এবং কোনো কোনো সময়, যখন আমি একটা গল্প লিখি, পরের দুই-তিন মাসে দেখা যায় আরো দুই তিনটা গল্প লিখে ফেলি। মূলত যেটা বলতে চাচ্ছি, গল্পগুলা সিরিজ আকারে আসে। একটা লিখলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, আরেকটা ‘আসে’। আমি কী রকম ইমেইজ ব্যবহার করি, এইটা তো তুমি জানোই, কিন্তু, জিনিসটা এইরকম। গল্পগুলা আমার উপরে এসে পড়ে। কিন্তু, তারপর এমনও হয়, বছর চলে যায়, আমি কিছুই লিখি না। কিছুই না। অবশ্যই গেল কয়েক বছরে আমি টাইপরাইটারে বসে বসে অনেক সময় কাটিয়েছি, রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখে। নিকারাগুয়া নিয়ে যা লিখতেছি, বা আর্হেন্তিনা নিয়ে যা-কিছু লিখেছি, অইগুলা সাহিত্যের জিনিস না, অইগুলা রাজনৈতিক সংগ্রাম বিষয়ক জিনিস।      

: আপনি অনেক সময় বলেছেন যে, কুবান বিপ্লবই আপনাকে লাতিন আমেরিকা ও তার সমস্যাগুলা নিয়ে ভাবতে শুরু করিয়েছে।

: এবং আমি আবারও অইটাই বলতেছি।

: লেখালেখির জন্য কোনো পছন্দের জায়গা আছে নাকি?

: না। যখন ইয়াং ছিলাম, বিশেষ করে প্যারিসে থাকা সময়টায়, আমি কাফেতে বসেই হপস্কচ এর বড় একটা অংশ লিখেছি। কারণ, শব্দে আমার কোনো সমস্যাই হত না আর সত্যি বলতে জায়গাটা আমার উপযোগী বলেই মনে হইত। লেখা বা পড়ার অনেক কাজ এখানেই করেছি। কিন্তু, সময়ের সাথে সাথে জটিল হয়েছি। এখন কিছুটা নীরবতার নিশ্চয়তা পাওয়ার পরেই আমি লিখতে বসি। যেমন, মিউজিকের মধ্যে বসে আমি একদমই আর লিখতে পারি না। মিউজিক এক জিনিস, লেখালেখি আরেক। একটা শান্তির দরকার আমার, যেইটা হল গিয়ে, একটা হোটেল, মাঝে মাঝে বিমানে বা বন্ধুর বাসায়, অথবা এইখানে নিজের বাসাতেই আমি লিখতে পারি এখন।

: আর প্যারিস? ত্রিশ বছর আগে প্যারিসে চলে আসার সাহসটা আপনি কিভাবে পাইলেন?

: সাহস? না, সাহস লাগে নাই। জাস্ট এইটা মেনে নিতে হয়েছে যে, আর্হেন্তিনার সাথে সম্পর্ক কেটে দিয়ে অই সময়ে প্যারিসে আসা মানে নিদারুণ দারিদ্র আর যাপনের কষ্টগুলাকে মেনে নিতে হবে। কিন্তু, চিন্তা করি নাই এইটা নিয়ে। আমি জানতাম কোনো ভাবে সামলে ফেলব। আমি প্যারিসে আসলাম, কারণ প্যারিস আর ফরাসি সংস্কৃতির প্রতি একটা আকর্ষণ ছিল আমার। একটা প্যাশানের সাথে ফরাসি সাহিত্য পড়েছি আর্হেন্তিনায়, তো আমি এইখানে আসতে চাইলাম আর চিনতে চাইলাম বইয়ে পড়া রাস্তা আর জায়গাগুলাকে। বালজাক বা বোদল্যের-এর রাস্তাগুলায় হাঁটতে পারা, রোমান্টিক অভিযাত্রার মত ছিল ব্যাপারটা। হ্যাঁ, খুবই রোমান্টিক ছিলাম তো। ইন ফ্যাক্ট, লেখার সময় আমাকে খুব সতর্ক থাকতে হত, যাতে… ব্যাড টেইস্ট বলব না, কিন্তু অতিমাত্রায় রোমান্টিসিজমের ব্যাপারগুলা যাতে না এসে পড়ে লেখায়। ব্যক্তিগত জীবনে তো এই নিয়ন্ত্রণের দরকার নাই। আমি খুব সেন্টিমেন্টাল, খুব রোমান্টিক। নরম মানুষ আসলে। অনেক কোমলতা আছে মানুষকে দেয়ার মত। আমি নিকারাগুয়া’কে যেইটা দেই এখন, সেইটা এই কোমলতাই। এইটা আবার রাজনৈতিক বিশ্বাস-ও যে, সান্দিনিস্তারা যেটা করতেছে, সেটা একটা প্রশংসনীয় সংগ্রাম; কিন্তু, শুধু রাজনৈতিক প্রতীতি না, একটা কোমলতাও কারণ আমি মানুষকে ভালোবাসি, কুবান মানুষ, আর্হেন্তিনার মানুষ। এইসব মিলিয়েই আমার চরিত্র। আমার লেখালেখির ক্ষেত্রে নিজের দিকে নজর রাখতে হত, বিশেষত যখন ইয়াং ছিলাম। কাঁদানোর মত জিনিস আমি লিখতাম। রোমান্টিসিজম ছিল, রোমান রোজ যে-রকম। আমার মা এইগুলা পড়ে কাঁদত।

: মানুষের জানাশোনার মধ্যে থাকা আপনার যে-লেখাপত্র, তার প্রায় পুরাটাই প্যারিসের আসার পরের, কিন্তু এর আগেও তো আপনি অনেক লিখতেন, তাই না? কিছু জিনিসতো অলরেডি প্রকাশিত হয়েছে।

: নয় বছর বয়স থেকে লিখতেছি, কিশোর ও তারুণ্যের সময় ধরে। একদম তারুণ্যের শুরুতেই আমার গল্প আর উপন্যাস লেখার ক্ষমতা ছিল, যেটা থেকে মনে হয়েছিল যে, আমি ঠিক পথেই আছি। কিন্তু, প্রকাশের জন্য অস্থির ছিলাম না। নিজের প্রতি কঠোর ছিলাম, এখনো আছি। আমার মনে আছে, আমার সমসাময়িকেরা, কয়েকটা গল্প বা কবিতা লিখেই প্রকাশকদের খোঁজে লেগে যেত। আমি নিজেরে বলতাম, “না, তুমি এখনই প্রকাশিত হচ্ছ না, নিজেরে সামলে রাখো।“ কিছু কিছু জিনিস রেখেছি, বাকি সবই ফেলে দিলাম। ত্রিশ বছর বয়েসে প্রথম প্রকাশিত হলাম, ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়বার জাস্ট আগে। আমার প্রথম গল্পের বই, বেস্তিয়ারিয়ো, ’৫১ তে বের হল, অই মাসেই প্যারিসের জাহাজে উঠলাম। লস রেয়েস নামে ছোট একটা টেক্সট এর আগে প্রকাশিত হয়েছিল, একটা সংলাপ মূলত। এক পয়সাওয়ালা বন্ধু, নিজের ও নিজের বন্ধুদের ছোট এডিশান করত, প্রাইভেট একটা এডিশান করেছিল। ব্যস, অইটাই। না, আরেকটা আছে, তারুণ্যের পাপ নামে একটা সনেটের সংকলন। ছদ্মনামে নিজেই প্রকাশ করেছিলাম অইটা।

: সাম্প্রতিক একটা ট্যাংগো এলবামের (ত্রতৈরস দে বুয়েনোস আইরেস) গীতিকার তো আপনি। ট্যাংগো লিরিক লেখা কিভাবে শুরু হল?

: দ্যাখো, আমি একজন খাঁটি আর্হেন্তিনো ও পোর্তেনিয়ো, মানে বুয়েনোস আইরেসের নাগরিক, কারণ এইটা একটা পোর্ট/ বন্দর। ট্যাংগো হলো আমাদের মিউজিক, আমি একটা ট্যাংগোর পরিবেশে বড় হয়েছি। রেডিওতে শুনতাম, কারণ রেডিও তো চালু হলো আমাদের ছোটকালে আর শুরু থেকেই খালি ট্যাংগো আর ট্যাংগো। আমার ফ্যামিলির কিছু পাবলিক, আমার মা আর এক খালা, পিয়ানোতে ট্যাংগো বাজাইতো আর গাইতো। এইভাবে ট্যাংগো আমার চৈতন্যের অংশ হয়ে উঠল, আর এটা আমাকে আমার তারুণ্যে, বুয়েনোসে নিয়ে যায়। তো ট্যাংগো সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল এবং যথেষ্ট ক্রিটিকাল, কারণ গড়পড়তা আর্হেন্তিনোর মতো আমি ট্যাংগো’কে বিস্ময়ের বিস্ময় মনে করি না। সামগ্রিকভাবে আমি মনে করি, ধরো জ্যাজের সাথে তুলনা করলে ট্যাংগো তো গরিবই। গরিব কিন্তু সুন্দর। অই গাছগুলার মত যেইগুলা সাধারণ  (অর্কিড আর গোলাপঝাড়ের মধ্যে কী তুলনা চলে কোনো!), কিন্তু, একটা অতুলনীয় সৌন্দর্য ধারণ করে। সম্প্রতি আমার এক বন্ধু এইখানে ট্যাংগো বাজাচ্ছে, কুয়ার্তেত সেদ্রোনেরা আমার দারুণ বন্ধু, এবং আরেকজন দারুণ বেন্দোনিওন বাজিয়ে হুয়ান মোসালিনি – তো আমরা ট্যাংগো শুনেছি, কথা বলেছি। একদিন আমার কাছে একটা কবিতা আসল এমনভাবে যে, আমার মনে হল, এইটাতে সুর করা যেতে পারে, কিন্তু শিওর ছিলাম না। তারপরে আমার অপ্রকাশিত কবিতাগুলা (আমার প্রায় সব কবিতাই অপ্রকাশিত) দেখতে দেখতে কিছু ছোট কবিতা পেলাম যেইগুলাতে সুর দেয়ার মত একটা বিষয় আছে, এবং ওরা দিল। উলটা কাজও করেছি, সেদ্রোন আমাকে মিউজিক দিয়েছে, আমি কথা লিখে দিছি অইটার উপর।

: আপনার বইয়ের আত্মজীবনীমূলক নোটে আপনাকে এমেচার ট্রাম্পেট-বাজিয়ে হিসেবে পাওয়া যায়। কোনো দলের সাথে বাজিয়েছেন?

:  আরে না। এইটা একটা লিজেন্ড, আমার প্রিয় বন্ধু পল ব্ল্যাকবার্নের উদ্ভাবন, যে খুব কম বয়সে মারা গিয়েছিল দুঃখজনকভাবে। সে জানত, আমি টুকটাক ট্রাম্পেট বাজিয়েছি, মূলত একলা নিজের ঘরে। সে আমাকে বলত, তোমার কিছু মিউজিশিয়ান খুঁজে বের করে ওদের সাথে বাজানো উচিত। ওরে আমি বলতাম আরে না, অই-যে আমেরিকানরা যেটা বলে, যেইটা দরকার অইটা আমার নাই। আমার মেধা ছিল না, স্রেফ নিজের জন্যই বাজাইতাম। আমি হয়ত জেলি রোল মর্টন বা আর্মস্ট্রং বা প্রথম দিকের এলিংটন—যেইখানে মেলোডিটা সহজ, বিশেষ করে ব্লুজ এর ক্ষেত্রে যেইটার সাধারণ একটা চলন থাকে। ওদের বাজানো উপভোগ করার পাশাপাশি আমি নিজেও আমার ট্রাম্পেট যোগ করতাম। ওদের সাথে সাথে বাজাইতাম, কিন্তু অবশ্যই ওদের সাথে না! আমি কোনোদিন কোনো জ্যাজ মিউজিশিয়ানের কাছে যাই নাই, আর এখন আমার ট্রাম্পেট হারায় গ্যাছে। ব্ল্যাকবার্ন অইটাই কোনো এক ব্লার্বে লিখে দিয়েছিল। এবং যেহেতু আমার একটা ফটো ছিল ট্রাম্পেট বাজানোর, সবাই মনে করত আমি খুব ভালো বাজাই। কিন্তু, আমি যেইরকম নিজে শিওর হওয়ার আগে প্রকাশিত হতে চাই নাই, অইরকম শিওর না হয়ে বাজাইতেও চাই নাই। এবং অইদিনও আর আসে নাই।

:  ম্যানুয়াল ফর মানুয়েল’র পর আর কোন উপন্যাসের কাজ করেছেন?

: না এবং খুব সুস্পষ্ট কারণেই। রাজনৈতিক কাজের কারণে। আমার নভেল লিখার জন্য পূর্ণ মনোযোগ আর সময় দরকার, অন্তত এক বছর শান্তিমতো কাজ করার সুস্থিরতা দরকার। যেইটা এখন আমার নাই। এক সপ্তাহ আগে আমি জানতাম না যে, তিন দিনের মধ্যে আমি নিকারাগুয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাব। যখন ফিরে আসি, তখন জানি না পরবর্তীতে কী হবে। কিন্তু, এই উপন্যাস অলরেডি লিখা হয়ে গেছে। এটা এইখানে আছে, আমার স্বপ্নের মধ্যে। আমি সব সময় এই উপন্যাসের স্বপ্ন দেখি। আমি জানি না উপন্যাসে কী ঘটবে, কিন্তু একটা আইডিয়া আছে আমার। গল্পগুলার মতোই, আমি জানি এইটা কিছুটা লম্বা হবে, কিছু ফ্যান্টাস্টিক উপাদান থাকবে, তবে খুব বেশি না। ম্যানুয়াল ফর মানুয়েল’র জঁরার-ই হবে এটা, বাস্তবের সাথে ফ্যান্টাসি যেইখানে মিশে যাবে; কিন্তু রাজনৈতিক বই হবে না। খাঁটি সাহিত্যের বই হবে। আমি আশা করি, জীবন আমাকে একটা ‘ডেজার্ট আইল্যান্ড’ দিবে, সেইটা এই ঘরই হোক না ক্যানো! কিন্তু, এক বছর দরকার… আমি এক বছর চাই… কিন্তু, এই মাদারচোদেরা—হন্ডুরান, সোমোসিস্তা আর রিগান— ওরা নিকারাগুয়া’কে ধ্বংস করতেছে, ফলে আমার কাছে আমার আইল্যান্ড নাই। লেখা শুরু করতে পারি না, কারণ অই সমস্যা সারাদিন আমার মাথায় থাকে। এইটা সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি চায়।

: এমনিতেই তো জীবন আর সাহিত্যের ভারসাম্য রাখা কঠিন…

: হ্যাঁ এবং না। এটা আসলে প্রায়োরিটির উপর নির্ভর করে। এখন প্রায়োরিটিগুলা যদি একজনের মোরাল দায়িত্বের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু, আমি এমন অনেককে জানি, যারা সব সময় অভিযোগ করছে, “ধুর, আমার নভেলটা লিখতে চাই, কিন্তু এখন আমার বাসা বিক্রি করতে হবে, এইটার ট্যাক্সের নানা কাহিনি আছে, কি করব?” অন্যান্য কারণ যেমন- “ সারাদিন অফিসে কাজ করি, লিখালিখিটা  করব কোন সময়?” আমি সারাদিন ইউনেস্কোতে কাজ করে এসে রাতে হপস্কচ লিখছি। কেউ যখন লিখতে চায় সে লিখে। লেখা ছাড়া যখন কোনো উপায় নাই, তখন সে লিখে।

     : অনুবাদ বা দোভাষীর কাজ করেন আর?

:  না, সেইটা শেষ। খুব সাধারণ জীবন যাপন করি। আমি যেইসব জিনিস পছন্দ করি—বই, রেকর্ড, তামাক—এইসব কেনার জন্য অনেক টাকা লাগে না। এখন সম্মানী থেকেই চলতে পারি। আমার বই এত ভাষায় ওরা অনুবাদ করেছে যে, বেঁচে থাকার মত এনাফ টাকা আছে। একটু সতর্ক থাকতে হয় আরকি, এখন আমি তো আর গিয়ে ইয়াট কিনে ফেলতে পারি না একটা, যদিও ইয়াট কিনার কোনো ইচ্ছাও আমার নাই…

: খ্যাতি আর সাফল্য কি আপনাকে সুখী করেছে?

: শোনো, আমি এমন একটা কথা বলব যেইটা বলা উচিত না আর কেউ আমাকে বিশ্বাসও না-ও করতে পারে, কিন্তু সাফল্য আমারে সুখি করে নাই। লিখালিখি করে জীবিকা অর্জন করতে পারি বলে আমি খুশি, তবে সাফল্যের জনপ্রিয় আর ক্রিটিক্যাল দুইটা দিকই সহ্য করতে হয় আমাকে। কিন্তু যখন কেউ আমাকে চিনতো না, তখনই বেশি খুশি ছিলাম। অনেক বেশি খুশি। এখন আমি লাতিন আমেরিকা বা স্পেনে গিয়ে দশ কদম হাঁটতে পারি না, লোকে চিনে ফ্যালে। আর তো আছেই অটোগ্রাফ, কোলাকুলি ইত্যাদি… এইটা খুবই মুভিং, কারণ ওরা রিডার এবং সাধারণত বয়সে বেশ তরুণ।  আমি খুশি যে, ওরা আমার কাজ পছন্দ করে, কিন্তু প্রাইভেসির দিক দিয়ে এটা খুবই যন্ত্রণার। ইউরোপের কোন সৈকতে আমি যেতে পারি না, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফটোগ্রাফার এসে পড়ে কই থেকে জানি! আমার শরীরী উপস্থিতিটাই এইরকম যে, লুকানো যায় না, ছোটখাটো হলে চশমা পরে শেইভ করে একটু চেষ্টা করতাম, কিন্তু আমার এই উচ্চতা আর লম্বা লম্বা হাত, দূর থেকে ওরা আমাকে চিনে ফ্যালে! আবার অন্য দিক থেকে, কিছু কিছু জিনিস আছে খুব সুন্দর… এক মাস আগে আমি তখন বার্সেলোনায় ছিলাম, গোথিক কোয়ার্টারে হাঁটাহাঁটি করছিলাম, এবং একটা আমেরিকান মেয়েকে দেখলাম, খুব সুন্দর দেখতে, চমৎকার গান গাচ্ছিল গিটার বাজিয়ে বাজিয়ে। জোয়ান বায়েজের মতোই লাগছিল ওর গান কিছুটা, খুব স্পষ্ট, মদির একটা কণ্ঠ। বার্সেলোনার ইয়াং ছেলেমেয়েদের একটা দল শুনতেছিল। আমিও শোনার জন্য থামলাম কিন্তু ছায়ায় ছায়ায় থাকলাম। অই সময় একটা ইয়াং ছেলে, বিশের মত বয়স হবে, খুবই হ্যান্ডসাম, আমার দিকে হেঁটে আসল। ওর হাতে কেইক ছিল, তো সে আমাকে বলল, “হুলিও, এক পিস নাও”। আমি এক পিস নিয়ে খাইলাম আর ওকে বললাম আমার কাছে আসার জন্য এবং এটা দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ”। সে বলল, “কিন্তু শোনো, তুমি আমাকে যা দিছো, তার তুলনায় এটা তো কিছুই না।“ আমি তাকে আলিঙ্গন করলাম আর তারপর সে চলে গ্যালো। তো, এই জিনিসগুলা, আমার লেখক-জীবনের শ্রেষ্ট পাওয়া। এই যে, একটা ছেলে বা মেয়ে তোমার সাথে কথা বলতে আসল, কেইক খাওয়াল, এটা অসাধারণ। লেখালেখির সব যন্ত্রণা সয়ে যাওয়ার জন্য এই যথেষ্ট।    

মূল সংস্করণ: https://www.theparisreview.org/interviews/2955/the-art-of-fiction-no-83-julio-cortazar

অনুবাদক-পরিচিতি:

1534982_10203636512860175_185431488_o
অমিত চক্রবর্তী। কবি। জন্মঃ ২৯ নভেম্বর, সিলেট। বর্তমান নিবাস যুক্তরাষ্ট্র। পেশায় মোটর প্রকৌশলী। যন্ত্র প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থঃ আন্তোনিয়োর মেঘ (২০১৬) তারাবাক্সে বসে লেখা (২০১৯) মকিংবার্ড (২০২০)। যোগাযোগ: ac05074@gmail.com




Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s