ল্যুকিং থ্রু দ্য রিয়ার্ভিয়্যু মিরর :: জাহেদ আহমদ

fnhum-05-00084-g009

অনেকক্ষণ ধরে খাতার পাতা খোলা আর আবজানোর খেলা আপনি খেলে চলেছেন, কবিতাখাতা, লিখতে পারছেন না। লেখা তো দূর, আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা আঁচড়ও কাটতে পারেননি দীর্ঘ এক ঋতু। শঙ্কায় আতুর আপনার মনে থেকে-থেকেই উঁকি দিচ্ছে সপ্রশ্ন সংশয় : চিরতরে বাঁজা হয়ে গেল বুঝি কলম ও করোটি! আর মনে মনে ভাবছেন, লিখে-যাওয়া আসলে একটা প্রকাণ্ড সাহসের কাজ। বুদ্ধিমানের সাহস দিয়ে গদ্য লেখা যায়, কবিতা নয়। কবিতা লিখতে গেলে চাই বোকার সাহস। বোকা কিচ্ছুটি না-ভেবে, আগুপিছু পরিণতিচিন্তা ছাড়া, ঝাঁপ দিতে পারে অতলান্তিকে; সাঁতার জানে কি না, নাও বাইতে পারে কি না লগি-বৈঠা ঠেলে, সেই-সময় এসব তার মনেই আসে না; জল দেখলেই ঝাঁপাতে চায়। আগুন দেখে তার পুড়ে যাবার ভয় নয়, নাচতে ইচ্ছে হয়। তা না-হলে তাকে বোকার সম্মান দেবে কেন জগৎ? ইত্যাদি, এইসব, ভাবছেন আপনি বিরামহীন আর খাতার পাতা খোলা-বুঁজানোর খেলা খেলে চলেছেন।

দুর্ভাবনাভারাতুর আপনার কেবল এই কথাটিই মনে হচ্ছে বারবার যে, হ্যাঁ, কবিতা লেখার জন্য সাহস চাই। আগডুমবাগডুম যাচ্ছেতাই লেখার সাহস। সুকুমার রায়ের মতো ক-জন সাহসী মানুষ আছে এখন এই লেখার জগতে? একজনও নেই বললেই তো হবে না, ফট করে কোনো সিদ্ধান্তদাগা বাক্য বলাও ঠিক নয়, ব্যাপারটা প্রমাণসাপেক্ষ। তবে আপনার সাহস একেবারেই গেছে এই কথাটাই আপনি জোর দিয়ে বলতে চাইছেন, ক্রিশ্চিয়ান্ কনফেশনের মতো অনেকটাই, নিজের নিকট নিজেরই স্বীকারোক্তি। আজকাল আর কবিতা লিখতে পারছেন না আপনি, কলমের একটা আঁকও ফুটাতে পারছেন না খাতাপাতায়। তার মানে আপনি বুদ্ধিমান হয়ে উঠছেন! বোকা ছিলেনই-বা কবে, বলেন? কবি ছিলেন কখনো? লিখতে পেরেছেন কখনো, কবিতা একটাও? অবশ্য চিরকাল আপনি বোকাই হতে চেয়েছেন, এই মর্মে আপনার দেওয়া সাক্ষ্য আমরা অবিশ্বাস করি না। তবে কি-না বৃথাই ভেবেছেন এতদিন, আপনার মধ্যে রয়েছে বোকার সাহস, ভেবেছেন কবিত্বে আপনি রবীন্দ্র-জীবনানন্দসম অথবা নেহাত কম না তাদের থেকে কোনো অংশে! লাফিং আউট লাউডলি … লোল … এবং এইভাবে বিচিত্রমাত্রিক অট্ট, মুচকি আর ফিচেল হাসির ভেতর দিয়েই এগোতে থাকে কবিতার ক্যারাভ্যান। বন্ধ্যাকাল কেটে যাবে, আমরা জানি, আপনার খাতা আবার ভরে উঠবে কবিতায়। ততদিন আপনার এই খাতাপাতা খোলা আর বুঁজানোর খেলা, এই স্যলিল্যকি, আর আপনার স্বগতোক্তির মাঝে মাঝে আমাদের এই ফোড়ন কেটে চলা…।


কেমন হওয়া উচিত হয়, আজ এই অতি-আহ্লাদের একবিংশকালের শুরুদশকের দশটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে এমনকি দ্বিতীয় দশকেরও যখন বৃত্তাঙ্কন সম্পন্ন হবার দোরগোড়ায়, ট্র্যানজিশনের এই টাইমে কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয় সমূহ আশঙ্কার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব বাংলা-কবিতা? ‘আশঙ্কা’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া খুব জরুরি ছিল? যুদ্ধটা কি ইতোমধ্যে সংঘটিত হয়ে গেছে বলবে না? এর জবাব এক-কথায় যেমন দেওয়া যায়, তেমনি একশ কথা খর্চে অনেক দলিল-প্রমাণ দাখিল করেও; কিন্তু উত্তর অপরিবর্তিতই থাকবে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে দেশে দেশে চলছে না বলছ? বিরান হয়ে যাচ্ছে না বলছ দেশের পর দেশ? সমাজ-রাজনীতিবিদ্বান মোটাসোটা ব্যক্তিবর্গ বলবেন, এক-দুইটা আফগানিস্তান আর ফিলিস্তিন-ইরাক-হার্জিগোবিনা-বোসনিয়া দিয়া দুনিয়া বিচারিলে তো হবে না মশাই! তথ্য-প্রমাণ চাই, বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিনির্ভর মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন চাই, আপনার বক্তব্যসমর্থক। কথায় কথায় সাক্ষী-সাবুদ পেশ করতে পারব না ভাই, ওইটা চাইলে এ-মুখো হবেন না দোহাই, নিজের ও অপরের টাইম ও স্ট্যামিনা খর্চা খামাখাই। আমি শুধু এই সময়ের কবিতা-করিয়েদের জিজ্ঞাসিতে চাই, যেমন চলছে তেমনই চলবে অত সাধের বাংলা-কবিতা আমাদের? বাস্তবের তপ্ত শলাকাগুলো থেকে পিঠ বাঁচিয়ে বেহায়ার হাসি হেসে মন্দমধুর পরাবাস্তবতা ফাঁদা অব্যাহত থাকবে অনন্তকাল? বাপ-ভাই সবাই মিলে মধুবাস্তবতার মহলা চলতেই থাকবে? প্রসঙ্গতই মনে পড়বে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় ভড়কে যেয়ে থিয়োডোর অ্যাডোর্নো বলেছিলেন, “দাশাউ-আউশভিৎশের পর আর কবিতা হয় না।” কবিতা হয়েছে এরপরও, এতদব্যাপারে শঙ্কিত সকলের চোখমুখে বালাই-ষাট বলে, তবে কি-না আগের কবিতাকাণ্ডের অভ্যস্ততা থেকে প্রায় খোলনলচে সমেত বেরিয়ে। এই ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী বিশেষত পূর্ব-য়্যুরোপের কবিতার। মিউশ, রুজেভিচ, হেরবের্ট, পিলিনশ্কি, হোলুব, পোপা, এন্ৎসেন্সবার্গার এবং এমনি আরও একগাদা নাম হড়বড়িয়ে বলে যেতে পারে আজকের যে-কোনো হাঁদাভোঁদা কবি কিংবা ভয়ঙ্কর অল্পবিদ্যাধর সূর্যপ্রণম্য কোবিদ। এর ব্যাখ্যা যেভাবেই করুন, ওই সময়ের কবিরা আন্দোলিত হয়েছিলেন এইটাই বড় কথা। আমরা হচ্ছি, কিংবা হয়েছি কখনো, ইত্যবসরে-ঘটে-যাওয়া আমার ছালচামড়ামাংসরক্তবীর্য-ছাতু-করে-ফেলা হাজারটা ঘাতে-অভিঘাতে এতটুকু আন্দোলিত? দুয়েকবার হয়েছি যদিও-বা, তার শিল্পানুগ প্রকাশে ব্রতী হয়েছিলাম? চটজলদি মিনাবাজার আর ময়দানমঞ্চে মুখ দেখাবার মচ্ছবে মেতে ভেসে গেছি বারবার আর রুখে দিয়েছি ঈপ্সিত গতি বাংলা-কবিতার। মিনাবাজার ভেঙে গেলে, ময়দান শূন্য হয়ে এলে, বাড়ি ফিরে এসে বসেছি বেদনাজাগানি বেহায়াবাস্তবতা বানাতে। এভাবেই কোনোমতে ভেসে আছে ঘোলাজলে বাংলা-কবিতার শীর্ণ ভেলাখানি। ও মাঝিভাই! ওপারে যাবার চাই, নিয়া যাবানি?


তাদেউশ রুজেভিচ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপর্বের পোল্ কবি, বলেছিলেন : “কবিতা আসলে মস্ত এক ধাপ্পা। তা না-হলে, কেন হলো, এতসব মহতো-মহীয়ান কবিতা সত্ত্বেও, যুদ্ধ আর কন্সেন্ট্রেশন্ ক্যাম্প, শোষণ-নিপীড়ন-জাতিহত্যা?” বলেই কিন্তু ক্ষান্ত দেননি তিনি, কিংবা সাধুবাবা সেজে ব্যাঘ্রছালগালিচায় বসে যাননি মন্ত্রপূত ব্যথানাশক বড়ি বিতরণে, নিজের ঘৃণা-বিবমিষা-বিদ্রুপ উগরে ঢেলেছেন কবিতার পর কবিতায়। “কাকে বলে কবিতা, যদি তা না বাঁচায় দেশ কিংবা মানুষকে?” — আরেক কবি, চেশোয়াভ মিউশ, খুব ক্ষেপে গিয়ে শুরু করেছিলেন কবিতা লিখতে। একটা সময় এই কথাটা নিয়ে অনেক হাসাহাসি করেছি স্বীকার করা যাক। কবিতার কাজ শিল্প হয়ে ওঠা, মানুষ বাঁচানোর মহৌষধ হতে হবে কেন কবিতাকে ইত্যাদি কলাকৈবল্যবাদী নানা ঠাট্টা-মশ্করা আমাদের খুব মনপসন্দ ছিল তৎকালে। আমার আশপাশের কবি-লিখিয়েরা, যদ্দুর বুঝতে পারি, তা-ই ভাবে এখনো। তবে আমি এখন ওই কথাটাকে হেলা করি না আগের মতো। সো-ফার আমি এখন ওই-রকমই ভাবছি। খালি সৌন্দর্য তৈরি করে যাওয়া, খালি ডুগডুগি বাজানো, কাঁহাতক সহা যায়? নক্ষত্রখচিত অঙ্গদখানি নিয়া নন্দনসম্মত নাচানাচিরও তো একটা বেলা-অবেলা আছে। আর প্রয়োজনের সময় মানুষ যদি তার প্রয়োজনীয় রসদ হাতের নাগালে না-পায়, তো কবিতা তারা চাটতে আসবে কেন? কবিতার গরজ কেবল দু-দণ্ড শান্তি দেওয়া? সেক্ষেত্রে কবিতার চেয়ে কদুর তেল অধিক কার্যকর নয়? কাতার বেঁধে কবিরা যদি পেসিফিস্ট ম্যুভমেন্ট পরিচালনার ভার কাঁধে নিতে থাকেন, চোখের ছানি কাটানোর শল্যচিকিৎসা তাহলে কে করবে? কিংবা ভিত-কাঁপানো ভীষণ মূর্তির ভূমিকা নেবেন না কবি, এমনকি ইমার্জেন্সি মুহূর্তেও! তোৎলা উচ্চারণই তবে কবিত্বের পরিচয়? রুদ্রচণ্ড রূপধারণ, যখন প্রয়োজন, মানায় না কবিকে? কবিতা তাহলে স্রেফ ভাব! গুলতাপ্পি আর ধাপ্পা! ভাব ধরা! কবি তাহলে ভাবমূর্তি এক! কিন্তু আমি তো পাঠক, এবং গদাই লস্কর নই বলা বাহুল্য, দ্রুত কর্মসমাধায় অভ্যস্ত। আর তোৎলামি আমার ধাতে নেই একেবারে। আমার এখন দরকার সাহস, আমি সাহসের কথা শুনতে চাইব, পড়তে চাইব সাহসের কবিতা। আমার দরকার প্রেমে হাসিল হওয়া, তো প্রেমের পদ্য টেনে নেব। তাহলে একজন কবিকে এই দিকগুলো মনে রেখে কবিতাসাধনা করে যেতে হবে বৈকি। আমার সাফ কথা। যুদ্ধের ময়দানে যেয়ে আমার বুঝি প্রেম দরকার হয় না? কিংবা সঙ্গম করবার সময় দরকার হয় না বিশেষ স্পৃহা আর প্ররোচনা আভ্যন্তরীণ? একটা নিয়ে পড়ে থাকলেই পিছিয়ে গেলে তুমি, একটার ওপর হামলে পড়া মানেই অন্য ফ্যাকাল্টিগুলো ইরেজ্ করে ফেলা। এমনটা হওয়া কী উচিত? এখন চলছে ওই একটাতে হামলে পড়ে থাকা।


উঁকি দিয়া যাচ্ছে এই যে একটা আমি  বারবার এবং মনে হচ্ছে এই রচনায় এর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ এত বেশি ঘুরেফিরেই হবে যে, অতএব, এর একটা ফায়সালা আগে হওয়া দরকার। এত যে আমি আমি আমি, কে বাপু তুমি? এই আমিটা কে? কোত্থেকে? কে বলতে পারবেন, কারে জিগামু, ফ্রেইদ্রিখ নিৎশে না মার্তিন হেইদেগার? কয়া পারেন, বোধহয়, সলিম বা মজহার। এই আমিটা কি আমি? হবে হয়তো। এটা তুমি নও? কেন নয়! এই আমিটা কি আপনি নন? নিশ্চয়ই! যার চেতনার রঙে চুনি হয় রাঙা আর পান্না হয় সবুজ প্রতিদিন, এ তো সে-ই। এ তো আমরাই। এ তো আমরাই, দেখেছি যারা বুনোহাঁস, শিকারীট্রিগার, কুয়াশাঝাপসা সার-সার মায়াবী স্ট্রিট্লাইট; এ তো আমরাই, রেখেছি যারা ভালোবেসে ধানের গুচ্ছের ’পরে হাত, শাটার-নামানো বিপণীবিতানের গলি চিরে সন্ধ্যাকাকের ন্যায় আকাঙ্ক্ষায় আমরা ফিরেছি যারা ঘরে প্রতিরাতে; প্রিয়মানুষের মুখের গন্ধ, শিশুর মুতের কাঁথা, ঘাস, রোদ, মাছরাঙা, নক্ষত্র, আকাশ, বৃষ্টিশিরিষের গাছ … আমরা দেখেছি যারা ঘুরেফিরে ইহাদের চিহ্ন বারোমাস; আমরা অনর্গল যারা কথা বলেছি, চুপ থেকেছি, ভয় পেয়েছি ও কদাচিৎ উঠেছি ভয়াবহ হয়ে … আমরাই এই আমি। কিছুই তো বোঝা গেল না। তা ঠিক, তবে কিছুই যে বোঝা গেল না এইটা তো অন্তত বোঝা গেল। তো কী চাও হে, আর্জিটা পেশ করো এবে! যেটুকু আঁচ করতে পারছি, দুর্ধর্ষভাবে আগুয়ান বাংলা-কবিতার এক্কাগাড়িটাকে তুমি নিয়ে যেতে চাইছ আদ্দিকালের দিকে ঘুরিয়ে, না, তুমি তো বাপু সুবিধের লোক নও হে! এপার-ওপার জুড়ে সেই মুক্তির দশক বা তারও আগে সেই চল্লিশা মানবদরদী ছিঁচকাঁদুনে সাহিত্যের দশা আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। তারপরও, কী বলতে চাও কী তুমি, ঝেড়ে কাশো! আজ্ঞে, আমরা পাঠকসাধারণ, ঝেড়ে কাশার মতো জোরটুকুও গলায় নেই কি-না, তাই এই মুহূর্তে আমাদের পর্যুদস্ত অবস্থা দেখে দেবেশ রায় রাজি হয়েছেন পাঠকপক্ষীয় উকিল হতে। এই কিছু বছর আগে ‘জারি বোবাযুদ্ধ’ জানুয়ারি সংখ্যায় একটা সাক্ষাৎকারে দেবেশ বলছেন : “আমি বলতে চাইছি, এই যে ‘আমরা’-র বোধ, এটা যদি আমার সামাজিক দায়িত্ব, রাজনৈতিক দায়িত্ব, এইগুলোর সঙ্গে গোলে-হরিবোল হয়ে শিল্পের দায়িত্বেও চলে যায়, তাহলে শিল্পের খুব দুরবস্থা। শিল্প ডেফিনিটলি, নিশ্চিতভাবেই, শিল্পের জন্যই শিল্প। শিল্প কারো কোনো উপকার করতে পারে না। কোনো সমাজবিপ্লব করতে পারে না। কিন্তু শিল্পই একমাত্র পারে যা দেখা যাচ্ছে না সেটাকে দেখাতে। সেই কারণেই ১৮১৪-১৫ সাল থেকে লের্মেন্তভ্-পুশ্কিন-গোগোল … এই দিয়ে, দস্তয়েভস্কি-তলস্তয় দিয়ে … এই করতে করতে আপনি যদি ১৮৯২-এ আসেন … যখন চেখভ এবং গোর্কি একইসঙ্গে লিখতে লিখতে বিংশ শতাব্দীতে ঢুকছেন তাহলে আমি একটা গ্রাফ দেখতে পাই … ‘আমি’ শব্দটার ওপর জোর দিচ্ছি … আরেকজন না-ও জোর দিতে পারেন … যে … এই প্রসেসের ভেতর দিয়ে যে-পাঠক যাচ্ছে … তার ছেলে যাচ্ছে … তার মেয়ে যাচ্ছে … তার বংশানুক্রম যাচ্ছে … সে-পাঠক ১৮৯২-এ লেনিন না-হয়ে পারে না। কারণ ইতোমধ্যে তার চৈতন্যের জগৎ বদলে গেছে। এইটাই শিল্পসাহিত্য করতে পারে। একা না … একটা উপন্যাসে না … কিন্তু শিল্পসাহিত্যই করতে পারে…”। এইবার বোধ হয় আমাদের অভিপ্রায় কিছুখানি স্পষ্ট করা গেছে। মাদারগাছের তলে বসে মানুষের জন্য মরাকান্না জুড়ে দেওয়া নয়, — আমরা যা চাই, — আবার নয় মানুষ ব্যতিরেকে মরমী মায়াজাগতিক জালবুনন। এরচে বেশি ভেঙে বললে একে বলদের জন্য রচিত প্রবন্ধ বলে ভেংচি কাটবে লোকে, জনাব, সেটি নিশ্চয়ই আপনাদের জন্য সুখকর হবে না। আমরা বরং আরেকটু শুনি দেবেশ রায় কি বলছেন : “আর্ট ফর আর্টস্ সেক্। শিল্পের জন্যই শিল্প। শিল্পবিচারের ক্ষেত্রে ওনলি ভ্যালিডিটি হচ্ছে, যে-সত্য লেখার মধ্য দিয়ে উঠে আসছে … তা আর্টিস্টিক্যালি ভ্যালিড কি না … এসব নিয়ে যে-লেখক ভাবিত ভগবান তাকে রক্ষা করুক। আমার কাজ, আমি যেটা দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি, ভাবতে পারছি, বানাতে পারছি, গোপন মতলব ঢোকাতে পারছি, তা বলা। তা না-বলে আমি যদি এক টুকরো মিথ্যেও শিল্পকর্মের মধ্যে ঢোকাই … ও কেউ টের পাবে না … ভেবে নিয়ে … নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন মিথ্যে বলতে এখানে আমি কি বুঝাচ্ছি … শিল্পকর্মটি ভস্ করে ভেঙে যাবে। কেননা শিল্পই একমাত্র জায়গা যা এক টুকরো মিথ্যেও বহন করতে পারে না।” তার মানে, ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ শোনামাত্রই আঁতকে ওঠার মতো সেকেলে বামাচরণের দরকার যেমন নাই, তেমনি ‘মানুষের জন্য শিল্প’ শুনেই ডাডাবাদী জজবা নিয়ে তেড়ে আসবারও কোনো দরকার নাই। আমরা সোজাসাপ্টা মানুষজন, আমাদের কামনাবাসনাগুলোও অত জটিল কিছু নয়। আমরা শিল্প বুঝি অথবা বুঝি না, আমরা মানুষ বুঝি অথবা বুঝি না, আমরা আমাদের আমিটাকে ষোলোআনা বাঁচায়ে রাখতে চাই। আমরা আমার আমিটাকে, আমরা আমাদের আমিটাকে, সাহিত্যের কি কবিতায় কি গল্পে কি উপন্যাসে কি চিত্রপটে কি সিনেমায় যুগপৎ আলো ও কলঙ্ক সহ হাজির পেতে চাই। অন্যত্র, এক প্রবন্ধে, দেবেশ এই সূত্রটি দিচ্ছেন : “সমকালকে ধরতে না-পারলে উপন্যাস বাঁচে না, আবার সমকালকে ধরেও উপন্যাস বাঁচে না। সমাজ, সময় আর ইতিহাসধৃত ব্যক্তিমানুষ হচ্ছে উপন্যাসের অন্বিষ্ট।” কাব্যের বা চিত্রপটের বা সেল্যুলয়েডের অন্বিষ্ট কি ভিন্ন কিছু? দেবেশেরও আগে এই সূত্রটিই কি কবিতাপ্রাসঙ্গিক একাধিক প্রবন্ধে প্রকাশ করে যাননি জীবনানন্দ দাশ? পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান, সময়চেতনা, ইতিহাসচেতনা আর প্রতিবেশচেতনা ইত্যাকার শব্দসমষ্টি জীবনানন্দের কবিতাভাবনায় ‘সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো’ নয় কি? ইঙ্গিতগুলো তো আমাদের অভিপ্রায়ের পক্ষেই যাচ্ছে। আমরা তাঁর ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধটিকে এখনও পথনির্দেশনাদাত্রী মনে করি, উদ্ধৃতি নিষ্প্রয়োজন যদিও; এখানে এখন তাঁর নিজেরই কবিতার বিশ্লেষণমূলক ‘কবিতা প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধ থেকে, যেটি ছিল বস্তুত একটি চিঠি, একাংশ উদ্ধার করি : “আজ পর্যন্ত যেসব কবিতা আমি লিখেছি সেসবে আবহমান মানবসমাজকে প্রকৃতি ও সময়ের শোভাভূমিকায় এক ‘অনাদি’ তৃতীয় বিশেষত্ব হিসাবে স্বীকার করে, কেবলমাত্র তারি ভেতর থেকেদ উৎস-নিরুক্তি খুঁজে পাইনি। … লিরিক-কবিও ত্রিভুবনচারী; কিন্তু তার বেলায় প্রকৃতি, সমাজ ও সময়অনুধ্যান কেউ কাউকে প্রায় নির্বিশেষে ছাড়িয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে না; অন্তত মানবসমাজের ঘনঘটায় প্রকৃতি ও সময়ভাবনা দূর দুর্নিরীক্ষ্য হয়ে মিলিয়ে যাবার মতো নয়। কাজেই উপন্যাস ও নাটকের মতো মানুষমনকে সমূলে আক্রান্ত না-করেও, কবিতা মানসের আমূল বিপর্যয় ঘটিয়ে দিতে পারে … কথা ও ইঙ্গিতের দুর্লভ স্বল্পতার ভিতর দিয়ে। … কবিজগতে যে-পাঠকেরা ভ্রমণ করেছেন তাদের মনে (কিংবা হাতে) ইহজগৎ আবার নতুন করে পরিকল্পিত হবার সুযোগ পায় তাই।” হায় হায়! এ-লেখা আখেরে একটা আদিগন্ত সদুক্তি-চয়নিকা হয়ে উঠবে দেখছি!


লিখতে বসে, লক্ষ করো, কেউ আর কোদালকে বলে না কোদাল; এতটাই ঘুরপ্যাঁচ কষে যে শেষমেশ কোদাল আর কোদাল থাকে না, হয়ে ওঠে ময়ূরপঙ্খী নাও! এমনভাবে কোদালের বর্ণনা দিতে শুরু করবে যে, কোদালের হাতলটাকে মনে হবে স্বর্ণনকশা-কাটা, আর তার পাতটা যেন জাহাজের প্রপেলার! এই প্রবণতা বিশেষভাবেই লক্ষ করা যাবে সাহিত্য-করিয়েদের মধ্যে; তদুপরি তিনি যদি হন কবি, তবে তো সোহাগা। সেটা তো সোনায় হয় বলে জানা ছিল, কোদালেও সোহাগা? হয়, খুব হয়, বাংলা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায়। অ্যানিওয়ে। দ্যাখো, বসেছেন তিনি তার নিজের রচনাপ্রেরণা সম্বন্ধীয় স্বীকারোক্তি দিতে, অবশেষে সেটি গিয়ে দাঁড়াবে সগর্ব আত্মপ্রচার নতুবা হা-হুতাশাচ্ছন্ন হায়াহীন মায়াচারণায়। স্মৃতিচারণা যদি শুরু হয়, তাহলে তো কথা শোনা দায়। স্মৃতিগৃহ চারিতে চারিতে তিনি স্মৃতিভিটে জুড়ে ঘুঘু চরিয়ে অতঃপর রেহাই। এই যদি হয় অবস্থা, ভাবছি আজকাল, বাংলা আখ্যান ফাঁদতে বসা এক-অর্থে সহজ অতিশয়। গাদাগাদা গালগপ্পোগুলতানিকারদের পেটের ঢেঁকুর শুনে মনে হয়, লেখালেখি নিতান্ত মামুলি বিষয়। তা-ই হবে হয়তো। তবে ভালো লেখা বা ভালো করে লিখে যাওয়া, তা যত কিংবদন্তির মতোই শোনাক, কারো কারো কাছে একটা সাংঘাতিক সংকল্প যেন। এক্ষেত্রে মোকাবেলা করতে হয় মূলত অভ্যাসনির্ভর স্বতঃস্ফূর্ত লিখনচর্চার। একইসঙ্গে খুব গবেষণা করে কোনোকিছু লিখতে গিয়ে মুশকিল বড় কম নয়। গবেষণাবাদ্য সারাক্ষণ বাজিয়ে যাওয়ার মানেই হচ্ছে, লেখার বীজ আপনার ভেতর যথেষ্ট দানা বাঁধে নাই।


আপনি বড়জোর আপনার লেখার প্রবণতা সম্পর্কে বলতে পারেন, সাধারণত আপনি কীভাবে লিখতে প্রাণীত হন বা লিখতে লিখতে আপনার লিখনগতি কোথায় কতটুকু টাল খায় বা কোন জায়গাটায় যেয়ে ত্বরণ পায়। বড়জোর আমি বলতে পারি আমার নিজের লিখনপ্রবণতা কেমন, আমার ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমার রূপ কেমন তা-ও হয়তো খানিকটা বলার চেষ্টা করে যেতে পারি। কিন্তু আমি কখনো, কোনোভাবেই, বলতে পারি না সত্যিকার-অর্থে লেখার প্রক্রিয়াটা কী বা কেমন। আমি সত্যি জানি না আদৌ এর, অর্থাৎ লেখার, স্থিরনির্দিষ্ট কোনো প্রক্রিয়া রয়েছে কি না। লেখার প্রক্রিয়া মানে আমি বলতে চাইছি রচনাপ্রক্রিয়া; সেই অর্থে স্থিরনির্দিষ্ট কোনো রচনাপ্রক্রিয়া রয়েছে বলে আমি মনে করি না। যা বলছিলাম, আমি কেবল নিজের লেখাচেষ্টার সাধারণ প্রবণতাগুলো ব্যক্ত করতে পারি এভাবে যে, আমি কীভাবে লিখতে লেগে অগ্রসর হই বা ঠিক কখন থমকাই বা পিছিয়ে পড়ি। যতদিন ধরে লিখছি, কিংবা আপনি লিখছেন যতদিন ধরে, দুই-চাইর-পাঁচ দশক বা দিন, ততদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে পারি বড়জোর। তেমনি আমি আমার পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অন্য লেখকের লিখনপ্রবণতা আমার পর্যবেক্ষণে কীভাবে ধরা দিয়েছে। অন্যেও সেভাবে আমার প্রবণতা সম্পর্কে তার আপন পর্যবেক্ষণজাত অভিমত জানাতে পারে। আর দ্যাখো, আমাদের আলোচকেরা ভুল করে এখানেই। তার মানে, গোড়াতেই ভুল করে তারা। বস্তুত ভুলের ওপরেই তাদের দাঁড়ানো, দাঁড়িয়ে থাকা। তাদের, মানে, আলোচক-সমালোচকদের। আমাদের দেশে এটি ভীষণভাবে সত্য। দৃষ্টান্ত দিতে পারব না এ-মুহূর্তে, তবে ব্যাখ্যা করতে পারি কি না দেখি। ব্যাপারটা এভাবে বলা যায়, আলোচকেরা লেখকের লিখনপ্রবণতা খুঁজতে না-গিয়ে লিখনপ্রক্রিয়া খুঁজে ফেরে। তাদের মন্তব্যসূচক বাক্যগুলো পড়লেই বোঝা যায়, যেসব কি-না ডাঁহা গাঁজাপায়ীদের রাজা-উজিরবধ কাণ্ডকারখানা, তারা সামগ্রিকভাবে একটা লেখা কীভাবে লিখতে হয় সেই সম্পর্কে তাদের অলস-মুহূর্তে-বানিয়ে-তোলা কিছু ছদ্ম তত্ত্ব কপচাতে উদগ্রীব। লিখনপ্রবণতা নয়, আলোচনাধীন লেখকের নিজস্ব লিখনভঙ্গিমা আবিষ্কার নয়, বরং জনগণের সামনে সাহিত্য রচনা করার আদর্শ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বক্তব্য উপস্থাপনে তারা সাতিশয় ব্যগ্র সবসময়। এটা অশ্লীল আস্পদ্দা ছাড়া আর কিছুই নয়। এবং ব্যাপারটা, ওই ব্যগ্রভাব, অত্যন্ত হাস্যকর সন্দেহ নেই। তারা এমনকি কোনোপ্রকার পর্যবেক্ষণপ্রসূত বাক্যরচনায় আদৌ উৎসাহীই নয়, যত উৎসাহ সব ওই আণ্ডাপাড়া আলটপকা মন্তব্য করে যেতে একের পর এক। আর এদেরই ভরের ফলে কি না জানি না, সাহিত্যের-খোঁজখবর-রাখা শৌখিনেরা কথায়-কথায় আলাপে বা আড্ডায় যে-কোনো লেখকের লেখালেখি সম্পর্কে মন্তব্য দেগে চটজলদি সিদ্ধান্ত নির্মাণে সিদ্ধহস্ত খুব। এরা, — পাঠবিমুখ এই দেশে এদেরকে বেশ-ভালো পাঠক না-বলে উপায়ও নেই, — কেবল স্যুইপিং কমেন্ট করে যেতে অভ্যস্ত; এবং এ ছাড়া এরা কথাই বলতে পারে না। আমার চেনা অনেক তা-বড়্ লোকেদের আমি দেখেছি, অমুকের লেখা আদৌ লেখাই হয় না বা তমুক একেবারে জঘন্য-যাচ্ছেতাই লেখে ইত্যাদি বলে লেখকের রচনাপ্রাণ বা লিখনপ্রবণতা আবিষ্কারের পরিশ্রমটুকু ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিতে। এই এক হ্যাপা আমাদের; হয় জঘন্য নয় অসাধারণ, এই দুই বিশেষণ ব্যবহার ব্যতিরেকে আমরা বেশিক্ষণ কথা চালাতে পারি না। আর আমাদের সমগ্র সমালোচনাসাহিত্য মোটের ওপর ওই দুই বিশেষণপ্রশাসিত বললে অত্যুক্তি হবে না আদৌ।


লেখার সঙ্গে (‘লেখা’ শব্দটির স্থলে ‘শিল্পরচনা’ বসাতে লোভ হচ্ছিল, বসাতে পারলে বেশ ওজনদার হতো) কথিত অনেস্টি বা সততার যোগ অল্পই। যা দেখছি বা যা দেখেছি তা-ই বর্ণনা করার নাম যদি লিখনসততা হয়, তাহলে বলতে হবে উহা সোনার পাথরবাটি। দশমিক শূন্যশূন্যশূন্য সামান্যাঙ্কের ক্ষেত্রেই ব্যাপারটি ঘটতে পারে, যা দেখে তা-ই লেখে একজন লেখক। এর কারণও রয়েছে। ঠিক এই মুহূর্তে আমার চারপাশে যা আছে তা-ই ছিল আমার পূর্ববর্তী দর্শক-বীক্ষকদের চারপাশে। যতই আমরা বলি যে দুনিয়া আর আগের মতো নেই, আসলে মূল জায়গায় খুব-একটা হেরফের হয়নি। যেমন গাছপালা, যেমন পশুপাখি, যেমন রাস্তাঘাট, যেমন নদী-নীলিমা, যেমন সমুদ্র, যেমন মহাদেশ-দেশান্তর, যেমন চকোর-চাঁদ-রাত্রি-জঙ্গল-নিসর্গ, যেমন মনোজগৎ ও মানুষের সম্পর্কগুলো। উনিশ-বিশ হয়েছে হয়তো। অবশ্য বলা চলে, এই উনিশ-বিশের ব্যবধান যে ধরতে পারে সে-ই সাচ্চা ও সহি পর্যবেক্ষক। এবং পর্যবেক্ষণ থেকে প্রকাশভঙ্গি-ও-ভাবনাগুণে লেখক। ইত্যাদি। যেমন আমি রোজ যে-সড়ক ধরে আপিশ যাই, যাতায়াত করি, সেই সড়কে দুইধার ভর্তি সার-সার অর্জুন আর জারুল। একহাত ফাঁকা নাই এমন লাগা-লাগা গাছগুলো। ঝাকড়া পাতা আর ছায়া। রোজ দেখি। দেখেই চলেছি বছরের-পর-বছর যাওয়া-আসার পথের ধারে। এখন আমি যদি কথিত সততার সঙ্গে ওই যা দেখছি হুবহু তা-ই লিখতে যাই, তাহলে অন্য কেউ বলার আগে নিজেই বুঝে ফেলব এটা জীবনানন্দের নিসর্গবর্ণনা অবিকল। তাহলে উপায়? উপায় নিশ্চয় আছে। সেজন্যেই বলছিলাম, লেখার সঙ্গে অন্তত কথিত সততার যোগ অল্পই। বানাতে হয়, নইলে পূর্ববর্তীর অনুকৃতি হয়ে যায় নির্ঘাৎ। একটু আগে দেবেশ রায়ও এই কথাই বলছিলেন, “আমার কাজ … আমি যেটা বানাতে পারছি, গোপন মতলব ঢোকাতে পারছি, তা বলা।” লেখার বা ‘শিল্পরচনা’-র ওইখানেই কারিকুরি, ওই বানানোতে।


যা দেখছি, যা ভাবছি, অবিকল তা-ই লিখব? নাকি ‘দেখা’ ও ‘ভাবা’ সারা হলে পরে লেখার সময় তাতে রং চড়াব? দেখা আর ভাবা, ওই দুই ক্রিয়া যদি কঙ্কাল হিসেবে কল্পনা করি, অপরদিকে লিখিত রূপটাকে যদি কল্পনা করি বিগ্রহ হিসেবে, কতটুকু মাংস চড়ানো সমীচীন তবে মূর্তির গায়ে? এই ধরনের প্রশ্ন বা সঙ্কটের উত্তরে অনেক কথাই বলা যায়। তার আগে কবুল করে নিতে হচ্ছে দু-ধরনের লেখার ব্যাপার নিয়ে এখানে কথা বলছি আমরা। এক হচ্ছে দেখে লেখা, আর হচ্ছে ভেবে লেখা। আরেকভাবেও বলা যায়, দৃশ্য থেকে উৎপন্ন লেখা বা ভাবনা থেকে উৎপন্ন লেখা। দেখা থেকে লেখার সঙ্গে যেমন ভাবনা জড়িত, ভাবনা থেকে লেখার সঙ্গেও তেমনি জড়িত দেখার ব্যাপারটা। এখানে যে-দুটো প্রশ্ন উঠছে তার গোড়া কিন্তু একটা জায়গায়, যে, লিখতে যেয়ে কতটুকু বা কতদূর পর্যন্ত বানানোর এখতিয়ার রয়েছে লেখকের। শিল্পসাহিত্য সৃজনের ক্ষেত্রে ‘মনের মাধুরী মেশানো’-র যে-ব্যাপারটা, তার সীমা কতটুকু? যা দেখব বা যা ভাবব, তা-ই হুবহু লিখব? বীক্ষণ বা চিন্তন ওইভাবে অনুসরণ আদৌ সম্ভব? অবিকল অনুসরণ সর্বাঙ্গ শোভন কি না, সে-ও এক বড় প্রশ্ন। তারচে বড় জিজ্ঞাস্য, চাক্ষুষ দেখা ও মস্তিষ্কের ভাবনা অবিকল অনুসরণ করে যাওয়ার আবশ্যকতা কতদূর? রামের জন্মভূমি অযোধ্যা কেমন ছিল তার একটা বেশ বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা ছেলেবেলায় মুখে-বলা গল্পে ঠাকুমা শুনিয়েছেন, বড় হয়ে রবীন্দ্রনাথ যা রচিবেন তার সঙ্গে ঠাম্মার শোনানো পাত্র-স্থান-কাল মিলে যাবে হুবহু? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এর একটা উত্তর দিয়ে গেছেন। এখানেই প্রশ্নটি গুটিয়ে আনা যায় এভাবে যে, দেখে কিংবা ভেবে সেই দেখা বা ভাবনার লিখিত রূপ দেওয়ার সময় কতটুকু স্বাধীনতা থাকে একজন লেখকের, লেখায় রং বা মাংস বা মাধুরী চড়ানোর? কতটুকু, অর্থাৎ কতদূর, বিস্তৃত সেই সীমা? বিদ্যার সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে অবিদ্যা না-মেশালে সাহিত্য হয় না, সেই রবীন্দ্রনাথেরই উক্তি, কতটা অবিদ্যা মেশানো শোভন তবে? আমরা একটু আমাদের মতো উত্তর তালাশ করে দেখি, অবিদ্যার আবশ্যকতা স্বীকারপূর্বক অবশ্যই।


দেখে লেখার সময় (চাদ্দিকের দৃশ্যদুনিয়া দেখেটেখে রয়েসয়ে লেখার সময়) যেটুকু স্বাধীনতা সাধারণত নিয়ে থাকি বিশেষ ওই লেখাটাকে মধুর/রঙিন/মাংসল করে তোলার প্রয়োজনে, ভাবনা থেকে যখন লিখছি তখনও কি ওই-পরিমাণ স্বাধীনতা নেব? ধরা যাক, নদী ও নদীতীরবর্তী চালচিত্র নিয়ে একজন-কেউ লিখতে বসেছে। তার আগে সে ওই নদী ও তৎতীরবর্তী জনপদ সরেজমিন ঘুরে এসেছে বলা বাহুল্য। বোঝাই যাচ্ছে, ইনি দেখা থেকে লেখার কাজটি শুরু করেছেন। দেখি তো, কতটুকু স্বাধীনতা নিতে পারেন তিনি! লেখাটা যদি সংবাদগদ্য হয়, অথবা এমনকি যদি সাহিত্যগদ্যও হয়, আমাদের অনুসন্ধানের পক্ষে কিছু উত্তর আমরা এখান থেকে পেয়ে যাব আশা করছি। তিনি লিখতে বসেই দেখলেন, লেখাটা কয়েক স্তরে লিখিত হওয়ার দাবি জানাচ্ছে। প্রথম স্তরে, যা দেখেছেন চর্মচক্ষে সে-সবের সানুপুঙ্খ বিবরণ। গাছপাতাপাখিনীলঝিলজঙ্গল ইত্যাদি দৃশ্যগোচরীভূত যাবতীয় জিনিশ ও নিসর্গ বর্ণনার পর তিনি কি করবেন? তিনি না-চাইলেও কিংবা চেতনে না-করলেও আরেকটা ব্যাপার একইসঙ্গে ঘটে যাবে এখানে, এবং তার নাম বিচার-বিবেচনা। লেখকের দেখার বাইরেও সেই ‘বিচার-বিবেচনা’ কাজ করতে পারে, এবং এর প্রকাশ ঘটে পূর্বাভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান/রচনাকালীন অভিজ্ঞতার তুলনা-প্রতিতুলনার মধ্য দিয়ে। লেখাটা দেখা থেকে হলেও এইভাবে ভাবনাও ক্রিয়াশীল থাকছে। অন্যদিকে ভাবনা ভিত্তি করে জন্ম নিচ্ছে যে-লেখা, সেখানে কী ঘটছে? লেখক এখানে কোথাও যাচ্ছেন না সরেজমিনে দেখতে কিছু, কোনো দৃশ্য তাকে তাড়িত করছে না, বরং তিনি তার বিমূর্ত/অদৃশ্য ভাবনাটাকে মূর্ত/দৃশ্যায়িত করতে চাইছেন; এক্ষেত্রে তিনি তার ভাবনাচিন্তার ভিত্তিতে রচনা করে চলেছেন দৃশ্য আসলে, যা তিনি দেখেননি কিন্তু ভেবেছেন যে এভাবেও দেখা যায় ব্যাপারটা, বা এতদিন ধরে লোকে যেভাবে দেখে আসছে সেই দেখার ভ্রান্তি নির্দেশ করতে যেয়ে লেখক তার ভাবনায় ধৃত যুক্তি বিস্তার করতে চাইছেন। এই দ্বিতীয় ধরনের লেখায় কিন্তু দেখা/দর্শনও রয়েছে, সেই দেখা বাইরের চোখের নয় বরং ভেতরের চোখের।

১০
বলছিলাম লেখা মাধুর্যমণ্ডিত/রঙদার/মশলাদার/মাংসল করবার ক্ষেত্রে একজন লেখক কতদূর পর্যন্ত অনুমোদন পেতে পারেন; ব্যাপারটি পুরো নির্ভর করছে লেখকের ওপর। এতক্ষণে অরিন্দম! হ্যাঁ, সেইটাই। এটাও তো লেখা একটা, বক্ষ্যমাণ, ভাবতে-ভাবতে লেখা বা লিখতে-লিখতে ভাবা! এখানে ওই বাহাদুরের কথা মনে পড়ে যাবে, যার নাম কলম, যে নাকি লিখতে-লিখতে বাহাদুর হয়ে ওঠে বলে লেখকেরা হামেশা বলে থাকেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সমস্ত ভাবনাভিত্তিক লেখার মধ্যে উপস্থিত দেখা, যেমন সমস্ত দেখাভিত্তিক লেখায় উপস্থিত ভাবনা। লেখায় কতটুকু পরিমাণে মনের মাধুরী মেশানো শোভন এতদপ্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল তো; তা, লেখক কি কখনো লাইসেন্স-পার্মিটের পরোয়া করে লেখেন? নাকি উচিত পরোয়া করা? লেখা সবসময়ই দেখা-অদেখা-ভাবনা-দুর্ভাবনা সমস্তের উর্ধ্বে। অকুস্থলে কোনোদিন না-গিয়েও ওই স্থানের নিখুঁত চিত্র এসে গিয়েছে লেখায়, এমন উদাহরণ অনেক রয়েছে। তেমনি বিশেষ কোনো-একটা ভাবনা বা ধারণা বা মতবাদ সম্পর্কে বিলকুল অজ্ঞ থেকেও লেখক তার লেখায় সেটা নিজেরও অগোচরে নিয়ে এসেছেন, এমন ঘটনা বিরল নয়। আসলে লেখাই ঠিক করে দেয়, বোধ করি, লেখক কি দেখবেন বা কি ভাববেন। লেখার ব্যাপারটা ওই ‘বন্ধনহীন গ্রন্থি’ আর ‘চলতি হাওয়ার পন্থী’, ইত্যাদি, রবীন্দ্রনাথাশ্রিত হয়ে কিছুটা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। কথা পুরানাই, ওই প্রেরণা। দৈবদাড়া, অলৌকিক আনন্দভার ইত্যাদি। আর পরিমিতিবোধ। দৈবতাড়ার তাগড়া ঘোড়া ছুটছে তো ছুটছেই, খানাখন্দ মানছে না বা পরিখার পাশে গিয়েও একই গতিতে ছুটেই চলেছে একবগ্গা, উপত্যকার খাড়াই বা উৎরাই সর্বত্র তার গতিবেগ ও চলার চাল সমান, একে কোনো কাজের ঘোড়া বলা যাবে? ঘোড়ারও তো প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, নইলে ঘোড়সওয়ারের দফারফা, তা কী আর বলতে! আর ঘোড়দৌড়প্রিয় দর্শকের কাছে সেই ঘোড়াটি যে একঘেয়ে-মনোটোনাস, তা-ও তো বলে দিতে হয় না। তাহলে স্বাধীনতার সঙ্গে পরিমিতিবোধ, যথেষ্ট পরিমাণে গোলমেলে নয়? তা, এ-আর তেমনধারা গুরুতর মীমাংসাদুরূহ প্রশ্ন হলো বুঝি!

১১
আহা-হাহাহাহা, স্বাধীনতা মানে এ নয় যে আপনে যাচ্ছেতাই করে বেড়াবেন। এ তো আপনে জানেনই। নিজের অধীন থাকা, স্ব-বশে থাকা, এ-ই স্বাধীনতা। রামকৃষ্ণ পরমহংস রসে এবং বশে রইবার কথা কইতেন সর্বদা। তা আপনে থাকেন বৈকি, সর্বদা সম্ভব না-হলেও। কিন্তু আপনি যখন লেখক, আরেকটু এগিয়ে আপনি তখন পরিস্থিতিকেও নিজের বশ রাখেন, পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। হতে পারে সে-পরিস্থিতি ভাষার, বা বক্তব্যের, বা ঘটনার, বা চরিত্রের। আর আবেগের নিয়ন্ত্রণ? সেইটা তো আরো জরুরি। ‘স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অফ ইমোশন’ ঘটতে ঘটতে আবেগের আমাশয় দেখা দিলে লেখার বারোটা বাজে। এইটা আকছার দেখা যায়, এই বারোটা-বাজা, ভেতোদের লেখায়। ভাবাবেগের ভেদবমি ভীষণ ক্ষতির কারণ, বলা বাহুল্য, একটা লেখা বা একজন লেখকের জন্য। বিশেষ একটা আবেগ দানাদার হয়ে ওঠার আগে তক লেখা যেমন লেখাই নয়, এইটা আলবৎ সত্যি, তেমনি এই আবেগ অন্যদিকে একটা লেখার সবচে বড় খতরনক শত্রু। ভেতোদের মধ্যে সত্যি ভালো যারা, নামজাদা যারা, তাদের লেখাপাঠে এইটে টের পাওয়া যায়। খেয়াল রাখা চাই, লেখায় এই নিয়ন্ত্রণ যেন পূর্বনির্ধারিত বা প্রাকপ্রকল্পিত না-হয়। লিখতে বসে বা লিখতে লিখতে লেখার ভেতর যেটুকু নিয়ন্ত্রণ, অভিপ্রেত সেটুকুই, এর বেশি নয়। মনে রাখতে হবে যে লেখার একটা স্বধর্ম রয়েছে, একে উপেক্ষা করা চলে না, এবং লেখার স্বধর্ম বিষয়ে যারা ওয়াকেফহাল তারা একে লঙ্ঘন করে লিখতেই পারবে না। ‘স্বধর্ম’ বলতে এখানে লেখার করণ বা কৃৎকৌশলের কথা বলা হচ্ছে না কিন্তু, এটি আরও ভেতরের ব্যাপার এবং বলা যায় অব্যাখ্যেয়, জীবনানন্দ তার ‘কবিতার কথা’-য় এই ‘স্বধর্ম’ শব্দের উল্লেখ করেছিলেন মনে পড়বে। অবশ্য ধর্মদ্রোহী হওয়া যায়, সেটি তো রোজকার ঘটনা নয়, বিদ্রোহ বরং দাবি করে বিদ্যমান বিধিবিধানগুলোর ওপর দখল ও বুঝেশুনে বীতশ্রদ্ধতা। তবে এই কথাটা এখানে বলে রাখা ভালো যে, লেখার স্বধর্ম জিনিশটা শাশ্বত এবং প্রকৃতির আর-দশ শাশ্বত জিনিশের ন্যায় এটাও কখনো উচ্চকিত হয় না। একটা ভালো লেখার ভেতরে তার স্বধর্ম সুস্থিত থাকে ‘আসন্ন নদীর ভিতর বিকেলের শাদা রৌদ্রের মতো’।

১২
এই লেখাটায় কয়েক অনুচ্ছেদ আগে স্পেশাল-একটা সর্বনামের পুনরধিষ্ঠান প্রার্থনা করা হয়েছে, বিশেষত কবিতায়, লক্ষ করে থাকবেন। কথা হচ্ছে, এর কি কোথাও কমতি পড়ছে আজকাল? বলতে সচেষ্ট এখানে যে, এই আমি কি কিয়দংশ কম ব্যবহৃত হচ্ছে অধুনা কাব্যে বা সাহিত্যের অন্যত্র? তদ্রুপ এর কাউন্টারব্যালেন্স ‘তুমি’ একেবারেই নিগৃহীত অত্র এলাকায়? না, ঠিক তা নয়। বরঞ্চ বহুল ও বোধাতীতভাবেই ব্যবহার হচ্ছে এর। দায়হীন, অঙ্গীকারহীন, নিরবয়ব, নিরবস্থানিক, নিমর্দ নির্বিকার ও ফাঁপা একপ্রকার আমি-তুমি হরদম ব্যবহৃত হচ্ছে বটে (এই সেরেছে! দায়-অঙ্গীকার-অবয়ব-অবস্থান ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করাই রিস্কি ইদানীং)। কবি যদিও দাবি করবেন অন্য, বলবেন সরলার্থে সর্বনাম ব্যবহার বহুদিন হলো উঠে গেছে কবিতাভুবন থেকে। সেটা হইলেও হইতে পারে, তবে আমাদের অগোচরে এখনোব্দি। স্বীকার করি, আমাদের চিন্তাভাবনা এক্কেরে সেকেলে। আমরা জানি না সর্বনাম বাদ দিয়ে কীভাবে কবিতা সম্ভব। কবিতার অন্যতম জাদুকাঠি ওই সর্বনাম। আমি, তুমি ও সে। এর বাইরে ভাষাজাগতিক ব্যবসা হতে পারে না। যা-ই বলুন কবি কিংবা কোবিদ, যতই বলুন, কবিতা আজও সম্ভব হয় নাই আমি-তুমি-সে ব্যতিরেকে। এই ‘তিনের পাখানি’ নিয়াই তো দুনিয়া। আর এই “তিন রসেতে ডুইবা তুমি তিনের অধিকারী হইয়ো আল্লার দোহাই” … এই ‘তিন’ বলতে আমি, তুমি এবং সে। এর ব্যবহার নট নেসেসারিলি সম্বোধনরূপে হতে হবে; বরং এর অপরূপ অনির্দেশ্যতা কাব্যিক আবহাওয়া ও আততি নির্মাণে কবিতানুকূল প্রদায়কের ভূমিকা পালন করে। এটা থাকলেই কবিতা পুরানাধাঁচ, না-থাকলে নয়া, ভাবাটাই ভুল। শুধু কবিতা কেন, যে-কোনো ফর্মে সাহিত্য বলতেই ওই তিনের উপস্থিতি। ঘোষিত নয় সবসময়, তবু বিরাজ করে। চট করে মনে হবে একটা-কোনো কবিতায় সর্বনাম অনুপস্থিত, তো অতএব উহা জোশ ও জটিল হয়েছে ইত্যাদি, ইম্পোসিব্যল্। দৃশ্যত না-থাকলেও, অনুক্ত বা উহ্য রয়েছেই, থাকতেই হবে। আমি-তুমি-সে ছাড়া সংসার হয় না, সঙ্গম হয় না, সাধুগিরি-সংঘর্ষ-শান্তিচুক্তি কিছুই হয় না, তাহলে কবিতা কেমনে হয় কন তো! কবিতা আপনি না-চাইলেও সর্বনাম ধরে তার কাজ করে চলে; মনে বা মাথায় বা অস্থিমজ্জায়, পাঠকের, সংক্রাম ঘটাবার কাজ। সর্বনামের এক সর্বাত্রিক সচলায়তন, বলা যায়, কবিতা। সাহিত্যের অন্যবিধ সংরূপের মধ্যে, যেমন উপন্যাস বা নাট্যাদিতে, নামশব্দের ছড়াছড়ি। কিন্তু কবিতায় সর্বনামের সানন্দ শাসন; বুঝি-বা তাই কবিতা এত সর্বসঞ্চারিকা। কবিতা আদি থেকে আজোব্দি তার শরীরে ও আত্মায় এত সংহতভাব ধরে রাখতে পেরেছে, এবং যে-কারণে অন্যান্য শিল্পপ্রকাশমাধ্যমের কারবারীরা একে সমস্তকিছুর নির্যাস বলে ভাবেন এবং মর্যাদা দেন সর্বশিল্পের শিরোশিল্প বলে, এর পেছনে এই সর্বনামের অবদান গৌণ নয়। নতুবা, ভাবুন একবার, জগৎ সয়লাব হয়ে যেত নামের তালিকায়। তাই তো বলছিলাম, প্রকাশচাতুর্য কবিভেদে ভিন্ন হলেও কবিকে আমি-তুমি ইত্যাদি সর্বনাম সনাক্ত করতে হয় নিষ্ঠার সঙ্গে স্বভাবানুযায়ী। ব্যক্তিতে বস্তুগুণ কিংবা বস্তুতে ব্যক্তিগুণ আবিষ্কার বা আরোপ যা-ই করুন, কবিতা বা অন্য সমস্ত শিল্পকৃতি ইটসেল্ফ একটা ব্যক্তিত্ব। অবধান করো, কবিবর! রহস্য ও রগড়ের নাম ভাঙিয়ে নিজেকে যতই নির্মোহ-নৈর্ব্যক্তিক নর্তক হিসেবে হাজির করুন, রিডিং বিট্যুয়িন দ্য লাইন্স্ লোকে কিন্তু খুঁজবেই আপনাকে। খুঁজবে একইসঙ্গে আপনাকে ও তাকে ও তার চারপাশটাকে। আজকের পাঠক তো খুঁজে নাকাল হবে, হ্যেরে আপনে থোড়াই পাত্তা দেন, কিন্তু আপনের অত সাধের মহাকালান্তরী পাঠক যদি বিছ্ড়ায়া না-পায় আপনেরে তাইলে তো মহাখারাবি ওয়েইট করছে আপনের জন্যে। এইটুকু মনে রেখে রহস্য-মশ্করা চালায়া গেলে কর্পোরেটলর্ডদের গ্রিপে থেকেও আমরা সমকালবাসীরা খানিক দিগদিশা পাই আপনাদের লেখাজোখা থেকে।

১৩
সেইটা না-হয় বুঝলাম। কিন্তু তুমি যেভাবে প্রোপোজাল্ দিচ্ছ, মিয়াঁ, খোদা না-করুক কবিরাও যদি সে-মোতাবেক প্রোজেক্ট লঞ্চ করতে লেগে যায়, বাংলা-কবিতা তখন পেছাতে-পেছাতে প্রাকরৈবিক শ্যামপিরিতিপর্বে চলে যাবে না বলছ? চুনিপান্নার অতিকায় আমিময়তা তথা রোম্যান্তিকদের অহমিকাপরায়ণ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, আধুনিকতার অ্যালিয়েনেশন তথা তালগোলানো উদরকুণ্ডয়ন, কনফেশনাল পোয়েট্রির আত্মহননবিলাস … এইগুলো তো কবে পেরিয়ে এসেছি আমরা, আবার পুরানা কারণবারি ফিরাতে চাইছ নবীনা বোতলে! হ্যাঁ, এই আশঙ্কাই করছিলাম, আমাদের ভাষণ মিসিন্টারপ্রেট হবেই নির্ঘাৎ; আমরা যা চাই তা ভালোমতো বুঝায়া বলতে পারলে তো দুনিয়াটার এহেন অবস্থা হইত না। ধুরো ভাই যাইতে দেন তো, ওইসব প্রমাণছাড়া পাঠকপ্রতিক্রিয়া ধর্তব্য হতে পারে না কখনো। তবে কি-না একটা ছোট্ট চ্যালেঞ্জ রয়েই গেল মোকাবেলার অপেক্ষায়। সেইটা হলো, পুরানাকালিক ওই আমি-তুমি দ্বৈত অধিকতর সচেতন ও পোক্ত অবয়ব দিয়ে লেখায় হাজির করা। যাপনের সবখানে, কেবলই লেখায় নয়, এদের সনাক্ত করা আর যুগোপযোগী সার-সেচ দেওয়া। আচ্ছা, ঠিক আছে, শিবসংগীত বেশি হলে ওদিকে ধানভানা ব্যাহত হবে। কাজেই কবিতায় সর্বনামগান আপাতত মুলতুবি।

১৪
“সাহিত্য সমালোচক যখন কথা বলেন, তখন তার অবস্থান যেন নিশ্চয়তায় দৃঢ়। যেন-বা তিনি দাঁড়িয়ে আছেন পোডিয়ামে, প্রবল আত্মবিশ্বাসে নিজের মত জানিয়ে দিচ্ছেন সামনে-বসে-থাকা শ্রোতৃমণ্ডলীতে। অথচ যিনি সাহিত্য রচনায় নিবিষ্ট, সাহিত্য নিয়ে কিছু বলার সময় তাঁর যেন সংশয়ের শেষ থাকে না। এ যেন একজন শিল্পীর নিমন্ত্রণ করে কাউকে তাঁর নিজের স্টুডিয়োতে নিয়ে যাওয়া, তাঁর শেষ-হয়ে-যাওয়া ও এখনো-শেষ-না-হওয়া ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দোলাচল ও ভঙ্গুর অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া; নিজের অভিজ্ঞতা শিল্পরসিকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।” এই কথাগুলো বাংলায় বলছেন সাজ্জাদ শরিফ, সম্প্রতি, ‘বাংলা কবিতার ছিন্নপথ’ নামের একটা প্রবন্ধে; যদিও উদ্ধৃতিধৃত বক্তব্য সাজ্জাদের নয়, চেক্ সাহিত্যিক মিলান্ কুন্ডেরার ‘দ্য কার্টেইন্’ নামে একটা বই থেকে তিনি কথাগুলো স্মরণ করেছেন। প্রবন্ধটা, নিঃসন্দেহে, ভাবনাজাগানো। সত্যি বলতে কি, আমার আজকালকার ভাবনার সঙ্গে সাযুজ্য খুঁজে পেলাম সাজ্জাদের ভাবনার। সেখানে, সেই প্রবন্ধে, সাজ্জাদ বর্তমান সময়ের বাংলা কবিতার দুটো মোটা-দাগের প্রবণতা নিয়ে কথা বলতে চেয়েছেন; এক হলো ঠাট্টা, যাকে তিনি ভাঁড়ামি বলতে ইচ্ছুক; দুই হলো ভাষা, ‘ভাষাকে নানাদিক থেকে ভেঙে দেওয়ার একটা অবিরাম চেষ্টা’ চালানো হচ্ছে আজকের বাংলা কবিতায়, সাজ্জাদের দেখাসূত্রে যেন আমরাও দেখতে পাই। দ্বিতীয় প্রবণতাটি ইতিবাচকভাবে দেখছেন তিনি, স্বাভাবিক, দূরপাল্লার বাংলা কবিতার জন্য যা কি-না আবশ্যিক পুষ্টি জড়ো করে রাখছে। এই ভাষাভাঙা কবিতার বিষয়ে আমরা শুনে আসছি মোটামুটি বিগত বছর-বিশ ধরেই। আসলেই কি তা-ই? ভাষা কি সত্যিই ভাঙা হচ্ছে, তদুপরি দিকে দিকে, ‘নানাদিক থেকে’? একটা চেষ্টা, অবিরাম বা সবিরাম, সবসময়ই থাকে যে-কোনো কালের কবিতাকারবারীদের মধ্যে; সেটা চোখে পড়ুক বা না-পড়ুক, ভাষাকে ভেঙে-ভেঙেই কবিতা এগিয়েছে এবং এগোচ্ছে প্রতিদিন। অন্যের কবিতা লাইন-বাই-লাইন কপি করে কেউ তো ছাপতে যাচ্ছে না, যদিও অন্যেরই কবিতা ইদিক-সিদিক করে নিজের ভাব ও বলবার কথাখানা চারিয়ে দিয়ে দিব্যি জীবন চলিয়া যাইছে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার। তা খারাপ কিছু না, জীবন চলিয়া যাইলেই তো হইল। কিন্তুক ঘাড়ব্যাঁকা পাঠক যদি বলিয়া বসে, কই, ভাষাভাঙা কাব্যের সাক্ষাৎ তো লভি নাই অদ্যাবধি! যা লভিয়াছি তা তো ওই উৎপল-রণজিৎ-মৃদুল আর বিনয়ী কায়দা বাগে এনে এস্তেমাল করা। ভাষাভাঙা না-বলে একে ভাষা গড়াপেটা বলা বাঞ্ছনীয় নয়? টেকনিক বলেন আর ডিকশন বলেন সবই তো গড়াপেটা, ম্যুর-অর-লেস্, পদ্মাপারের বেপারিদের ইতিহাস বলতে গেলে এ-ই। এরই ভিতর দিয়ে অবশ্য কেউ কেউ স্বীয় কল্পনাপ্রতিভার বরাতে বেশ অবিসংবাদী হয়ে উঠতে পেরেছেন। সবই ঠিক আছে। ম্যাচ-ফিক্সিং তো মোটামুটি শিল্প বলেই স্বীকৃত আনোফিশিয়্যালি। কিন্তু গোল বাঁধে ভাষাভাঙার প্রশ্নে। এহেন দাবির প্রেক্ষিতে কেউ যদি, কোনো অকপট থোঁতাকাটা পাঠক, বঙ্গীয় ভাষাভাঙা কাব্যের এ-যাবৎ লভ্য ফায়দা ও ফজিলত সম্বন্ধে শিক্ওয়া জানায়, তার জওয়াব চট করে পাওয়া যাবে? যদি জিজ্ঞাসে কোনো জন, ভাষাভাঙা কাব্যের কুতুবমিনারে একটাও কৈতর উড়ে এসে বসে না কেন তয়? এখানে কৈতর মানে কবুতর হয়, আর কবুতরের তফসির হয় প্রাগ্রসর পাঠক। সে বরং দেখে যে, ভাষাভাঙার বুজরুকি দিয়ে এলেবেলেদের ঐরাবত প্রদর্শনী; ইহা সাড়ম্বরে চলিতেছে এই দেশে। এটা অবশ্য ঠিক যে, একটা পোর্শন অফ পোয়েট বেশ শক্তি ও শৌর্যের সঙ্গেই ভাষা ব্যবহার করেন কবিতায় এবং এতে করে মেইনস্ট্রিম বাংলা পোয়েট্রি নিঃসন্দেহে ব্রেইক্-থ্রু পায়। ওদিকে বড্ড গোলমেলে একটা অংশ আজীবন ‘পরীক্ষাসাহিত্য’ করে চলেন। উহাদের পাশ-ফেল নাই, দোলনা থাইকা কবর পর্যন্ত দিনরাত খালি পরীক্ষা আর পরীক্ষা। তাহাদের এই বোধটুকু লুপ্ত যে, পরীক্ষাসাহিত্য বলিয়া আদৌ কোনো বস্তুর অস্তিত্ব অন্তত সৌরজগতে গ্রাহ্য নয়। হয় সেটা সাহিত্য হয়েছে অথবা হয়নি, বিবেচনা তার হাতেই যিনি এর প্রণেতা, সিদ্ধান্ত ওই কবি কিংবা লেখককে নিয়ে নিতে হয় ছাপাবার প্রাক্কালে। এই ভাষাভাঙা আর নিরীক্ষানাচের অজুহাতে অজস্র অজভূতে ছেয়ে যায় সাহিত্যের সমকাল, এবং এটা আজকের সমস্যা নয়, সমস্যাটা প্রায় সবসময়ের। এতক্ষণে একটা কাজের কথা জিগাবার চাই। এই যে, যে-সমস্ত কবিতা বা অন্য লেখাপত্র কথিত ভাষাভাঙা বা নতুন বলে প্রতিভাত হয় আমাদের নিকট, আদতে সেসব চেতনাভাঙার ফল নয়? ভাষাকে ভাঙা মানে তো ওই সিন্ট্যাক্স-অর্ডারের ওলটপালট, ওইটাই সব! সত্যিকারের বিপর্যয়টা ঘটাতে হয় চেতনায়, চেতনার জায়গায়; তবেই-না বলা যাবে এটা ভাষাভাঙা সাহিত্য হয়েছে, অথবা নিদেনপক্ষে একটা সৎ ও সঙ্গত চেষ্টা হয়েছে ভাঙার, তার আগে নয়। সেই-রকম অভিজ্ঞতা, আমাদের সৌভাগ্য যে, এরই মধ্যে ছিঁটেফোঁটা হলেও লভেছি আমরা; এবং স্বয়ং সাজ্জাদ শরিফ এমন কিছু অভিজ্ঞতা আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন বটে, প্রথানুবর্তী কবিতাচৈতন্যে বেশ বিপর্যয়কর ক্র্যাক ধরাবার কাজে তিনি ব্রতী ছিলেন সুদূর অতীতে, সেসবই থেকে গেছে ‘ছুরিচিকিৎসা’-র বাইরে যদিও। ছুরিচিকিৎসায় ইন্ডিয়ান বাংলা কাব্যস্বরই লভ্য যদিও, জয়োচ্ছ্বাস ও উৎপলকণ্ঠ। অনুরূপ সাজ্জাদেরই সময়ের ও তার আগের-পেছনের আরও কয়েকজন। তবু ওই বিশেষ পর্বের সাজ্জাদ ও তৎসঙ্গীদের কবিতাচেষ্টা বাংলাদেশের কাব্যেতিহাসে আলোচনাযোগ্য। ওই-রকম অভিজ্ঞতা আমাদের খুব ঘনঘন ও অবিরাম হয়েছে বলে তো মনে পড়ে না। আহা, অত বকবকানির পক্ষে এক-দুইটা উদাহরণ দিবা-না? না, পাঠকের দায়িত্ব নয় ওটা, প্রোফেশন্যাল্ পোয়েট্রিক্রিটিক তাহলে কেন রয়েছে বলুন? তবে বুঝুন অবস্থা! প্রাণিজগতে এই পাঠক আদৌ পবিত্র কোনো প্রজাতি নয়, তার লক্ষ্মী লিজেন্ড মনে রেখেই বলছি, বরঞ্চ সমালোচকের চেয়েও বত্তর/বদতর ক্ষেত্রবিশেষে; এরা আল ডিঙায়ে ঘাস খেয়ে সাঁই হতে চায় সহজে চিরকাল। এই আলডিঙা পাঠক সম্পর্কে চলন্ত রচনার একটা জায়গায় বেশ জোর গলায় সতর্ক করা হয়েছিল স্মরণ করুন।

১৫
আচ্ছা বেশ; এবার ভুলে যাবার আগে সেই ঠাট্টাতামাশা বিষয়ে দুটো-একটা কথা যা আমরা জানি তা বলে ফেলি। কবুল করে নেওয়া ভালো, অধুনা ঠাট্টাকাব্য ওই লক্ষ্যভেদী তির-ধনুর ভূমিকায় নেই আর, ওটা বল্গাহারা ভাঁড়ামিরই নামান্তর এখন। ভাঁড় হিসেবে এই মুলুকে মশহুর গোপালের জ্ঞানগম্যি বিষয়ে কেউ সন্দেহ করে না, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রও গোপালকে সপ্রশ্রয় সমীহ করতেন। গোপালের তীক্ষ্ণবুদ্ধির আয়ুধ গিয়ে রাজার গায়ে বিঁধত ঠিকই, ক্ষেপে কাঁই হয়ে যেতেন কৃষ্ণনগরের স্ফীতবপু রাজামশাই, কাতুকুতু টের পেয়ে পরক্ষণেই বিহসি উঠিত সর্বশরীর তার। ফলে রাজাই চাইতেন ফিরিফিরি গোপালের অমন আমোদে-প্রহার। কিছু কি মেহ্সুস হলো? আমাদের আধুনিকোত্তর ঠাট্টাকাব্যের দশা হয়েছে ঠিক তা-ই। বাঙ্গালা ভাষাভূখণ্ডে এই আয়ুধটা, — ঠাট্টা, — আজও ঈশ্বরগুপ্তের আদল থেকে বের করে কেউ ব্যবহার করতে পারছে না। আফসোস! ফলে আমোদ-প্রমোদে পর্যবসিত হতেছে সমস্ত চেষ্টা; হতেছে রগড়ের পর রগড়, তারপর আরও রগড়, তারপর? হুজুরে-জোকারে মিলে হেসে কুটিপাটি। কিন্তু এই পর্যায়ে, নব্বইয়ে এসে নবপর্যায়ে, বাংলা কবিতায় ঠিক যে-পরিস্থিতিতে ঠাট্টার ট্রিগারিং শুরু হয়েছিল, তখনকার পার্সপেক্টিভ ও পটভূমিটাও স্মরণ রাখা দরকার। তার আগে একটা ছোট্ট সংশোধনী দিয়ে নিই। শ্লেষ-বিদ্রুপ-ব্যঙ্গ-ব্যাজস্তুতি-বক্রোক্তি-কথাকূট-কৌতুক-উইট-হিউম্যর-স্যাটায়ার প্রভৃতি কবিতার পুরানা কাঁচামাল, আচমকা আজকেই নাজিল হয়েছে এমন নয়, কবিতায় এগুলো প্রযুক্ত হয়ে চলেছে আদিকাল থেকে। যে-কোনো শান্তরসাস্পদ কাব্যেও ওই উপাদানগুলো বা এর কোনো এক/একাধিকের দেখা আমরা পেয়ে থাকি। কিন্তু সহি নিয়তে কেবল এ-ই ভিত্তি করে বা এগুলোকে অস্ত্র হিসেবে শানিয়ে নিয়ে যখন লিখিত হয় কবিতা, শ্লেষ-বিদ্রুপ-স্যাটায়ারই যখন তুরুপের তাস, আমরা কথা বলছি সেই বিশেষ ফিচারের কবিতা নিয়ে। এখন কি বলা যাবে যে, এই ধরনের কবিতা পাঠককে কাতুকুতু ছাড়া আর কিছু দিতে পেরেছে গত বিশবছরে? অথচ এ-ধারার জিনিসগুলো ‘প্রতিকবিতা’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা পুরামাত্রায় ছিল, হয়ে উঠেছিল যেমনটা বহুলাংশে যুদ্ধপরবর্তী পূর্ব-য়্যুরোপের কবিতা, বাংলাপাঠকের ভেতরে সেই প্রত্যাশা জাগ্রত করেছিলেন বটে ঠাট্টাকাব্যপ্রণেতারা, অন্তত এই কথাটা আজ বলা যায়। রে ভুসুকু, সকলি বিফলে ভেল্! স্মরণ করে দেখুন, কবিতা যখন হয়ে উঠেছিল ঘ্যানঘ্যানে বেদনাবাদী আর মিনমিনি মিস্টিকদের মজমা, পেটরোগা প্রেমিকদের প্রেমগানে পর্যুদস্ত যখন অমাবস্যা-পূর্ণিমা, নানাবিধ মাজাব্যথা-হাড়মড়মড়ি-হৃদিচিনচিনি আর স্যাঁতস্যাঁতে কাৎরানিচিৎকার প্রচারের মাধ্যম যখন কবিতা, ঠাট্টাকাব্যরচয়িতারা ঠিক সে-মুহূর্তে কনভোয়ভ্যানভর্তি নিয়ে এলেন ত্রাণপঙক্তিমালা। আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম, উত্তরাধুনিকতার নামে ঊনকবিদের মূর্খাচার বুঝি চিরতরে শেষ হওয়ার সাইরেন বাজিয়া উঠিল! অভাগা পাঠকের কপালে সুখ সইল না। ঠাট্টাকাব্য হয়ে উঠল, — দুর্ধর্ষ প্রতিকবিতা নয়, — বল্গাহারা ভাঁড়ামির আসর। সেই আসরের মধ্যমণি যিনি বা যারা, চমৎকার, আজও করে চলেছেন তারা মার্জারছানা-মুখে-রেখে স্পেক্ট্যাক্যুলার হাস্যপ্রদর্শনের সার্কাস্টিক কারবার। ফলে মেধাবী বেশ-কয়েকজন কবির করুণ পরিণতি ঈশ্বরগুপ্তের পর আরেকবার প্রত্যক্ষ করল আবহমান বাংলা কবিতার পাঠক। যদিও এ-ধারার কবিতাকৌশল/টেক্নিকের অভিঘাত এ-সময়ের বাংলা সাহিত্যে ইতিবাচকার্থে একেবারেই পড়েনি বললে বীনাপাণি বেজার হবেন; পড়েছে, এটা টের পাওয়া যায় নব্বই-পরবর্তী কবিদের কাজ দেখে। বেদনাবাদ্য বাজানোর বদপ্রবণতা পুরো লোপ পেয়েছে বলা যাবে না, প্রাদুর্ভাব কমেছে এটা বলা যায়। আর বেদনার বিরুদ্ধেও নই আমরা, তাই বলে, স্বাগত জানাই সৃষ্টির জন্য অত্যাবশ্যক অকৃত্রিম ও স্বতঃস্ফূর্ত সমস্ত বেদনা। আপাতত ওই দেবেশ রায় যে-কথাটি বলছিলেন, প্রাগুক্ত আলাপে, শুনে আমরা প্রসঙ্গান্তরে যাই : “ … আমার কাছে বেদনা ছাড়া আর লেখার কোনো বিষয় নেই। এবং বিস্ময়ের কথা যেটা, সেটা হচ্ছে … সংস্কৃতে ‘বেদ’ কথাটির অর্থ জ্ঞান … জানা … যা থেকে বিদ্যা। বিস্ময়ের কথা যেটা … এই একই ধাতু থেকে ‘বেদনা’। … আমি পড়াশোনা করেছি আমার নিজের ক্ষমতার মধ্যে যতটা সম্ভব। কোনোকিছুকেই মনে হয় না যে এটা আমার বিষয় নয়। তার মানে আমি যে সব বিষয়ের যোগ্য তা তো নয়। … আমি যতটাই পড়াশোনা করেছি, জ্ঞানচর্চাতে পরিত্রাণ খুঁজেছি, ততটাই বেদনা নিয়ে ফিরে এসেছি। … আমি শুধু এটুকুই নিজেকে প্রস্তুত রেখেছি, আমি যেন আরো বেদনার মধ্যে ঢুকতে পারি।” কিছু বুঝলেন, মুহতারাম? শুদ্ধ বেদজ্ঞ পণ্ডিত ও শুদ্ধ বেদনাবাদী কবিরাজ উভয়েই সাহিত্যসৃজনের নির্জন ঝরনাতলায় সমানভাবে উটকো বলে গণ্য হবেন। ওই যে ভাষাভাঙা আর ঠাট্টাপার্টি দিনরাত বিচিত্র অ্যাক্রোব্যাটিক্ কসরত করেও পাঠক ভিড়াইতে কামিয়াব হতে পারছে না তার কারণ একদিকে বেদনাহীন বেদ অন্যদিকে বেদহীন বেদনা। তবে, জানা অত জরুরি হয়তো নয় যে, বেহুলা কখনোই বিধবা হয় না, আর বাংলারই রীতি ইহা আবহমান।

১৬

তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছেন আপনে, এতক্ষণে, এই রচনার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-গভীরতা আন্দাজ করতে না-পেরে। নেই তো, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-গভীরতা, থাকলে নিশ্চয় ঠাহর পেতেন। পুরাটা ফাঁপা, ঠাসঠাস আওয়াজ হচ্ছে। হেন অনাব্য প্রবন্ধ নজিরবিহীন সংযোজন বাংলা সাহিত্যে। এমতাবস্থায়, প্রবন্ধ গভীর করবার লক্ষ্যে, শেষ চেষ্টা হিসেবে একটা ইনিশিয়েটিভ নিতে চাইছি। ইহা আর কিছু নয়, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মারফতে মিরোস্লাভ হোলুব থেকে একটা কোলাজ্ খাড়া করব, তিতিবিরক্ত আপনাদের তরফ থেকে কিছু তারিফ যদি পাওয়া যায় এই আশায়। প্রবন্ধবক্তব্য বস্তুতপক্ষে এই প্যারাগ্রাফে এসে একটা সৎ ও সম্পন্ন অবয়ব পেতে যাচ্ছে। এবং সেইসঙ্গে হোলুবের পঙক্তিনিচয় বঙ্গীয় তরুণ কবিকুলের হাল-ছেড়ে-দেওয়া হারিকিরি রোধ করতে বেশ কার্যকর হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। শোনা যাক তবে, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মারফতে মিরোস্লাভ হোলুব : “যদিও কবিতা জেগে ওঠে তখন, যখন আর-কিছু করার নেই; যদিও কবিতাই শৃঙ্খলাসৃষ্টির শেষ চেষ্টা, বিশৃঙ্খলা যখন অসহনীয়; … যদিও শিল্পী হওয়া মানেই ব্যর্থ হওয়া আর শিল্প ব্যর্থতারই বশম্বদ … যদিও অন্যকোনো জগতের চেয়ে কবিতার জগতে বেশিভালোভাবে কেউ বাঁচে না; যদিও কবিতার জগৎ রুক্ষ ও বিষাদময়, আধ্যাত্মিক ইতিহাসের ঊষর নিরানন্দে যার সৃষ্টি ও বিলয়; যদিও শিল্প কোনো সমস্যার সমাধান দেয় না, বরং জামার মতো গায়ে দিয়ে-দিয়ে তাকে জীর্ণ করে ফ্যালে, যেমন বলেন সুজান সনটাগ; তবু কবিতাই একমাত্র তরোয়াল ও ঢাল; … কবিতা শূন্যতার বিরোধী। শূন্যতার মধ্যে কবিতাই অস্তিত্ব। তার যুদ্ধ সহজাত ও হাতফেরতা শূন্যতার বিরুদ্ধে; প্রাথমিক আর মাধ্যমিক শূন্যতার বিরুদ্ধে। … নক্ষত্রমণ্ডলগত যে অন্তরীক্ষ, তা শূন্য নয়; কিন্তু একটা পোড়োবাড়ির মতো শোচনীয় শূন্যতা আর-কিছু নেই। কিংবা কোনো কাজেই লাগল না যে-চিন্তা। … আর শূন্যতা শুধু কোনো-একজন লোকেরই মাথাব্যথা নয়, নয় কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির ব্যাপার। তার বিশৃঙ্খলার জন্যই সে সকলের বিষয়, সকলের বিবেচ্য … সেখানেই শূন্যতা, যেখানে কোনো নবীন সৃষ্টিতে পূর্ণতা নেই বা নেই কোনো শৃঙ্খলার বিন্যাসের স্থায়িত্ব। … আমি মোটেই মনে করি না যে আমাদের অস্তিত্ব কোনোকিছুর সারাৎসার, বরং আমাদের অস্তিত্ব কোনো সারাৎসার দিয়ে ভর্তি করে দেয়াটাই আসল, তাতেই ‘হওয়া’, তাতেই ‘প্রয়োজন’। তাতেই আমরা সত্যি ‘আছি’। অথবা আমি ‘আছি’। … সন্দেহ নেই, কবিতা নেহাৎই এক খেলা। সন্দেহ নেই, কবিতা শুধু বাঁচে তার জন্মের মুহূর্তে আর পড়বার মুহূর্তে, আর খুব বেশি হলে স্মৃতির আলোছায়ার খেলাধুলোয়। সন্দেহ নেই, একই কবিতায় কেউই দু-বার প্রবিষ্ট হতে পারে না। সন্দেহ নেই, কবি গোড়া থেকেই আন্দাজ পেয়ে যান যে কোনো উদ্দেশ্যই তার নেই, যেমন বলেছেন হেনরি মিলার। সন্দেহ নেই শিল্প তখনই জনসাধারণের গ্রহণযোগ্য হয় যখন তার পতন হয় নিছক যান্ত্রিকতায় আর তার নিয়মকানুন পর্যবসিত হয় নিছকই অভ্যাসে। তবু তার উদ্দেশ্যহীনতায়, শব্দের প্রতি তার মরিয়া নাছোড় আনুগত্যে, তার জন্ম-পুনর্জন্মের আদিম শৃঙ্খলায়, কবিতাই হলো সবচেয়ে বড় জামানত, যে আমরা এখনও কিছু করতে পারি, যে শূন্যতার বিরুদ্ধে এখনও আমাদের কিছু করার আছে, যে আমরা এখনও হাল ছেড়ে দিইনি, বরং কোনোকিছুর কাছে এখনও নিজেদের উৎসর্গ করতে পারি। সবচেয়ে বড় জামানত, যে আমরা কেবল তথ্য-সংবাদের সংরচনা নই … কারণ শিল্প কোনো সমস্যার জট খোলে না, সমাধান দেয় না, বরং তাকে গায়ে দিয়ে-দিয়েই জীর্ণ করে ফ্যালে। কারণ শিল্প শুধু ব্যর্থতার কাছেই বিশ্বস্ত। কারণ যখন কিছুই করার থাকে না, তখনই কবিতা। …”

১৭
আপনার খাতাপাতা খোলা আর আবজানোর খেলা, হে ঢেরদিন-লিখনবন্ধ্যাত্বে-ভোগা আলাভোলা কাব্যরচয়িতা, আজও থামে নাই? জনতার সমবেত হাসাহাসি আর আপনার দোনোমোনো স্বগতোক্তির ফোকর দিয়ে বিস্তর ফোড়ন কেটে ক্লান্তপর্যুদস্ত আমরা এবার গেহে ফিরিবারে চাই। জনান্তিকে যে-বিবেক গেয়ে ফেরে গরিমার গান, তার সনে গলা মিলিয়ে নীড়ে ফিরে যাই। এদিকে কালাপাহাড় কবিদের কালোয়াতি বেঁচেবর্তে থাক; আমরা তাদের কালজয়ী শিল্পোত্তীর্ণ বুলন্দ্ দরোয়াজা কামনা করি। আর কবিতা যারা লেখেন, কবিতা যারা ছাপেন, কবিতা নিয়া যারা রাজনীতি করেন, কবিতা কেন্দ্র করে যারা আড্ডা দেন, কবিতা প্রসঙ্গে যারা তর্কপ্রতর্ক-নিবন্ধপ্রবন্ধ লেখেন, কবিতাই যাদের যাপন, কবিতা যাদের ধ্যান-জ্ঞান-পরিত্রাণ সহি-বড়-সোনাভান, কলেজে কলেজে যারা কাব্যপ্রভাষক, যারা কালে ও কালান্তরে কবিতা পড়ান তাদের সবার প্রতি সশ্রদ্ধ প্রীতি ও নমস্কার! নমস্কার দুই-হস্ত কপালে ঠেকিয়ে, দূর থেকে। কমসে-কম দুশো গজ দূর থেকে তাদিগের পানে আমরা বাকহীন বিস্ময়ে তাকায়া থাকি। তাগো সনে আমাগো সাক্ষাৎ ইহজন্মে ঘটিবার নয়; কেননা তাদের নিবাস মর্ত্যধূলির বাইরে মহাকাল, আর আমরা কি-না নিতান্ত সমকালজীবী। যে-জীবন দোয়েলের ফড়িঙের … যে-জীবন দগদগে ঘা আর দাঁতে-দাঁত-চাপা দহনের … যে-জীবন অবিরাম অসহায় অবনমনের … যে-জীবন অগত্যা আপোসের … যে-জীবন গনগনে ঘৃণা আর ফুঁসে-ওঠা রাগ আর রক্তবমনের … যে-জীবন কানাগলির কুকুরের … যে-জীবন সবেতন ক্রীতদাসের … যে-জীবন স্বপ্নাঢ্য রক্তিম বাসনা আর প্রেমদ্রোহবিষাদের … যে-জীবন আমার-আপনার-আমাদের … আমারাপনারামাদের … যে-জীবন মামুলি মানুষের, ময়ূরচূড়ায় ঝিমধ্যানস্থ অথবা জলকেলিবিলাসী রহস্যরসিক কবিদের সনে তার হয়নাকো দেখা বাইচান্স। হতো যদি, বাংলা কবিতা তাতে ধড়ে একটা মানানসই মুণ্ডু আর হৃদয়ে এক টুকরো দুর্দান্ত কলিজা ফিরে পেত।

12165848_10207825223979133_1177776206_n

।।জাহেদ আহমদ( কবি, গদ্যকার, অনুবাদক)।।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s