অন্য ভাষার কবিতা :: মোসাব্বির আহে আলী

images

কবিতা আর গানের মধ্যে একটা স্পষ্ট ব্যবধান আছে।  গানের বাণী না হলেও অন্তত এর সুর সর্বব্যাপী, বুঝতে কোন ভৌগোলিক ও ভাষিক প্রস্তুতি লাগে না,  সবার কানেই ঝংকার তৈরি করে, অন্যদিকে কবিতাকে অবশ্যই বোধগম্য হতে হয়। এবং তা স্পষ্টভাবেই। নাহলে এর সঘন পরিমিত শরীরের যে গুঢ় আহ্বান বা অর্থ তা বোধের অধীন হয় না। ফলে কবিতার বাণী যদি অন্য ভাষায়, অন্য দেশ ও সংস্কৃতির মোড়কে লুকনো থাকে, তাহলে তা একজন ভিন ভাষার পাঠক নিজের ভাষায় বুঝতে চায়। আর সেজন্যই ভাষান্তরের প্রসঙ্গ আসে। এখানে আমি  আমাদের সমকালে (দ্বিতীয় দশকে) কয়েকজন ভিনদেশী তরুণের কবিতা বাংলায় তরজমা করার চেষ্টা করলাম। একই সাথে পঞ্চদশ শতাব্দীতে একজন চীনা রাজার( পরবর্তীতে নির্বাসিত) একটি ক্লাসিক কবিতার বাংলায়নও যুক্ত করা হলো। উল্লেখ্য, প্রতিটি কবিতায় একটি সাধারণ বিষয়ের অবতারণ আছে, আর তাহলো মিউজিক বা গান। এই কবিতাগুলো একসাথে জড়ো করার এটিই মূল কারণ  ]

ল্যাং লেভ (Lang Leau), কবি ও ঔপন্যাসিক। জন্ম থাইল্যান্ডের থামারাতে, ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে। প্রকাশিত বই: Misadventure(2013), Lullabies(2014)  Sad girls(2017), Poemsia (2020) September Love(2020)।

 বিশ্বাসঘাতকতা

আমি সংশোধন করতে পারি না
যা আমি করে ফেলেছি;
আমি গলায় ফেরত নিতে পারি না
যে-সুর আমি গেয়ে ফেলেছি;
এবং আমার আফসোসের
সবচে’ কষ্টদায়ক দিক হলো—
আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না
আর তুমি পারো না ভুলতে।

তুমি থাকার আগে

আমি যখন উপরের দিকে তাকাতাম
কেবলই আকাশ দেখতাম
গাইতে পারার মতো যতো গান
কারণ না জেনেই গাইতাম
যা আমি বুঝেছি, ভেবেছি,
তার পেছনে একটাই কারণ,
এটা কখনোই তুমি ছিলে না
যতক্ষণ সেখানে কোন কিছু ছিল।

 এরিন হ্যানসন (Erin Hanson), জন্ম ১৯৯৫ সালে ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ায়। প্রকাশিত বই The Poetic Underground(2014), The Voyage(2014), The Dreamscape (2016)।

তুমি নও

তুমি তোমার ‘বয়স’ নও
নও তোমার পোশাকের আকার
তুমি কোন ‘ওজন’ নও
নও তোমার চুলের বাহার
তুমি তোমার ‘নাম’ নও
নও তোমার থুতনিতে টোল
তুমি তা-ই যত বই পড়ে’ছ তুমি
তুমি তা-ই যত শব্দ তুমি ব’লো
তুমি তোমার সকালবেলার কর্কশ কণ্ঠ
এবং সে হাসি যা তুমি লুকাতে চাও
তুমি তোমার হাসিতে লেপ্টানো মিষ্টতা
এবং প্রতিটি কান্নারও জল
তুমিই সে গান যা তুমি জোরে জোরে গাও
যখন তুমি জানো তুমি চির একা!
তুমিই সেই জায়গা যেখানে তুমি ছিলে
যাকে তুমি ‘আশ্রয়’ বলতে
তুমিই সে বস্তু যা তুমি অন্তরে বিশ্বাস করো
যাদেরকে তুমি ভালবাসতে- ওরাও তুমি
তোমার শয্যাঘরে তুমিই তোমার ছবি
এবং যা স্বপ্নে তুমি দেখ, তা-ও তুমিই
অনেক সৌন্দর্য ও মনোযোগ দিয়ে তুমি তৈরি
কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি তা ভুলেই গেছো
আর যখনি জেনে গেছো আসলে তুমি কী
ঠিক তখনি তুমি আর কিছু নও

সালেহ ইন্দ্রিস বামজী ( Saaleha Idris Bamjee)। কবি ও ফটোগ্রাফার। জন্ম ১৯৮৩ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে। একমাত্র প্রকাশিত কবিতার বই: জিকর।

ঈশ্বর

আমি তোমাকে খু্ঁজে বেরিয়েছি
হাতের দোলনায়
এবড়োথেবড়ো খাদে
আর ফাঁপা ঢিবিতে
আমার বুড়ো আঙুল
সে-ই কলম যা পয়গম্বরদের দোয়াত-এ ডুবানো
যা আমি প্রার্থনার জায়নামাজের স্তূপে ঘষে চলেছি
মুঠোভরা জোহানসবার্গের তুষারে
আমি এখনো সে-ই শিশু
যে তোমাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে

ই-হং-ওয়াই ( ১৪৫১ খ্রি.-১৪৫৭খ্রি.)। তিনি জোসিয়ান কিং ড্যানজং (Joseon King Danjong) নামে অধিক পরিচিত। তাঁর রাজত্বকাল ১৪৫২-১৪৫৫ খ্রি. অব্দি মাত্র তিন বছর স্থায়ী ছিল। তিনি গ্যাংওয়ান প্রদেশের ইয়ংওল নামক জায়গায় নির্বাসিত হন ও মৃত্যুবরণ করেন।

নির্বাসন

যখন আমি ছেড়ে যাচ্ছিলাম আমার রাজসিক প্রাসাদ
তখন আমি ক্ষুব্ধ এক পাখি;
টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছি আমারই একাকী ছায়া
নীল পর্বতগুলোর মাঝখান দিয়ে;
ঘুমের জন্য হাত পেতেছি রাতের পর রাত
তবুও সে ঘুম আসেনি
বছরের পর বছর কেটেছে দুঃখ-দুর্দশায়
তবুও তাঁর হয়নি অবসান
গান থেমে গেল; শেষরাতের ফ্যাকাশে চাঁদ
পর্বতের চূড়ায় রইল ঝুলে
রক্ত বয়ে গেল, বসন্তের উপত্যকায়
ঝরে গেল রক্তিম পাপড়ি;
যখন যাযাবর রাতের পাখির গানে
স্বর্গও দেয় না কোন মনোযোগ
তখন কেনই-বা এই চিরদুখীর
কান এতো সজাগ?

লেখক-পরিচিতি:

ahe

[মোসাব্বির আহে আলী, জন্ম ১৯৮৭, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে। ঢাকায় স্থায়ী। পেশায় প্রকৌশলী। মূলত কবি। কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক হিসেবেও সুনাম রয়েছে তাঁর। প্রকাশিত বই,  ঈর্ষাগাছ ও প্রার্থনাসমূহ( গল্পগ্রন্থ, ২০১৭), তন্দ্রা এভিনিউ ( কাব্যগ্রন্থ, ২০১৯), Poetics of Green Delta ( ব্যবস্থাপনা সম্পাদনা, বাংলা কবিতার ইংরেজি সংকলন, ২০১৭) প্রকাশিতব্য উপন্যাস ‘ইরেক্টাসের হাসি’, ২০২৩]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s